নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা, বুধবার ১২ জুন ২০১৯, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ৮ শাওয়াল ১৪৪০
ফুটওভারপাস না আন্ডারপাস?
মো. জিয়াউল হক কামাল
মামা/ভাগ্নের দৈনন্দিন ফোনালাপের এক পর্যায়ে মামা ভাগ্নেকে বলেন, ঢাকা শহরে তুমি কি খেয়াল করেছ মানুষ হাত তুলে, গাড়ির গতি কমিয়ে, থামিয়ে, সড়ক বিভাজক ডিঙিয়ে-এর ফাঁক গলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পারাপার হচ্ছে অথচ কাছেই ফুটওভারপাস থাকলেও তা ব্যবহার করছে না। শুধু তাই নয় ফুটওভারপাসে এসকেলেটর আছে (বনানী ফুটওভারপাস) কিন্তু পুলিশ বাধ্য না করলে মানুষ তাও ব্যবহার করতে চায় না।

ভাগ্নে বলল, হ্যাঁ মামা এতো খুব সাধারণ এবং নিত্য চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে- এ এক কঠিন বাস্তবতা। এর কি কোনো সহজ সমাধান হয় না মামা?

এসব সমস্যার পুরোপুরি সমাধান করাটা কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয়। আর এর পটভূমি জানতে হলে তোমাকে আরো শুনতে হবে, কথা দীর্ঘ হবে, মামা ব্যালেন্স নেই, পড়ে কথা হবে বলে ফোন কেটে দেয়া যাবে না কিন্তু!

না, তা বলব না।

মামা বলেন, বাংলাদেশের মোট আয়তন ১,৬৭,৬৭০ বর্গকিলোমিটার, লোকসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি আর ঢাকা শহরের আয়তন প্রায় ৩০৬ বর্গকিলোমিটার। শিক্ষা, ব্যবসা, কর্মসংস্থানের সর্বোচ্চ সুযোগ সম্পন্ন শহর, এই ঢাকার ৩০৬ বর্গকিলোমিটার পরিসরেই বাস করে ২ কোটি মানুষ।

ঢাকা শহরে অন্যান্য স্থাপনার তুলনায় রাস্তার পরিমাণ মাত্র ০৭ শতাংশ, যার মোট দৈর্ঘ্য ৩ হাজার কিলোমিটার, এর মধ্যে ২০০ কিলোমিটার প্রাইমারি, ১১০ কিলোমিটার সেকেন্ডারি, ৫০ কিলোমিটার ফিডার এবং বাকি ২৬৪০ কিলোমিটার সরু/অপ্রশস্ত সড়ক যা অপরাপর সংযোগ সড়কের সাথে সংযুক্ত।

ভাগ্নে বলে, মামা, ইন্টারেস্টিং, বলে যান।

মামা বলেন, ঢাকায় ফুটপাত আছে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার কিন্তু এর শতকরা ৪০ ভাগ হকার, আবর্জনার স্তূপ এবং নির্মাণ সামগ্রী দ্বারা সর্বদা বেদখল। রাস্তায় তুমি আরো পাবে শতাধিক বাজার এবং গাড়ি পার্কিং-এর জায়গা না থাকা প্রায় ৩ হাজার শপিং মল।

এরপর আছে যানবাহন। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর এক হিসাব অনুযায়ী আগস্ট ২০১৮ পর্যন্ত ঢাকায় নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ১১ লাখ ৭৩ হাজার ১৬০টি, এর মধ্যে মোটরসাইকেলের সংখ্যা অর্ধেকের ও বেশি। আর ব্যক্তিগত গাড়ির (প্রাইভেট কার) সংখ্যা ২ লাখ ৫২ হাজার ৬৭৪টি। বাস আছে ৩৯ হাজার ৭৮২টি। প্রতি মাসে প্রায় দেড় হাজার নতুন ব্যক্তিগত গাড়ি নিবন্ধিত হচ্ছে।

ভাগ্নে শুনছতো? হ্যাঁ, মামা, মনোযোগ দিয়ে শুনছি।

এতো গেল ঢাকা শহরের এক প্রান্তের একমুখী জটিলতার কথা। এ শহরের অপর প্রান্তে আছে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যস্ততম জয়দেবপুর-ঢাকা- নারায়ণগঞ্জ রেলপথ। এ পথের গুরুত্ব এতো বেশি যে, ২০ জোড়া কমিউটার ট্রেন চলে জয়দেবপুর-ঢাকা রেলপথে এবং ১৬ জোড়া কমিউটার ট্রেন চলে ঢাকা- নারায়ণগঞ্জ রেলপথে। এর উপরে আছে সারাদেশ জুড়ে চলা আন্তঃনগর ট্রেনসহ সব ধরনের মেইল ও লোকাল ট্রেন এবং কন্টেইনারবাহী বিশেষ ট্রেনসহ মালবাহী ট্রেন। রেল কর্তৃপক্ষের দেয়া তথ্য মতে দেখা যায় যে, এই পথে প্রতিদিন প্রায় ২০০ ট্রেন চলাচল করে থাকে। জয়দেবপুর-নারায়ণগঞ্জ ৫০ কিলোমিটারের এই রেলপথে আছে ৮৫টি লেভেল ক্রসিং। আর মাত্রাতিরিক্ত অথচ অপরিহার্য এই বিপুল সংখ্যক লেভেল ক্রসিং ট্রেনের শ্লথগতির অন্যতম কারণও বটে। ফলে দুর্বিষহ দীর্ঘ যানজট এবং মর্মান্তিক দুর্ঘটনা জয়দেবপুর-ঢাকা- নারায়ণগঞ্জ রেলপথের নিত্য সাথী। দেশের দৈনিক পত্রিকা/মিডিয়ায় প্রকাশিত তথ্যের উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর এঙ্েিডন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউট (এআরআই) কর্তৃক গবেষণামূলক একটি উপাত্তে দেখা গেছে কেবল জয়দেবপুর-ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথে ২০১৫ সালে ২৭৩ জন এবং ২০১৬ সালের জানুয়ারি হতে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে ২১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে দুর্ঘটনারোধে ২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ব্যয়ে জয়দেবপুর-নারায়ণগঞ্জ রেলপথে ওভারপাস ও আন্ডারপাস নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই শীর্ষক প্রকল্প শেষে সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে আরও ০৭টি ওভারপাস ০৭টি আন্ডারপাস নির্মাণের প্রস্তাব বিবেচনাধীন আছে।

বলেন কি? এবিষয়গুলোতো জানা ছিল না! তবে মামা, আমি ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জেনেছি যে, ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের উত্তর এলাকায় ৪৩টি এবং দক্ষিণ এলাকায় ৩১টি ফুটওভারপাস আছে। ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির সিভিল এন্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের ২০১৫ সালে 'রাস্তা পারাপারে প্রদত্ত সুবিধা গ্রহণে পথচারীদের আচরণ' শীর্ষক গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায় যে, নিত্যচারীগণের শতকরা ৭৬ ভাগের যাত্রাপথ ৫ কিলোমিটারের কম ও শতকরা ৫০ ভাগের যাত্রাপথ ২ কিলোমিটারের কম হওয়ায় মানুষ হেঁটেই যাতায়াত করতে সুবিধা বোধ করে বেশি।

আবার, ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন রিসার্চ এন্ড ইনোভেশন ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং (আইসিআরআইসিই-২০১৮) এ 'ঢাকা শহরে ফুটওভারপাস ও আন্ডারপাস সুবিধা ব্যবহার' বিষয়ক পরিসংখানে গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, ঢাকা শহরে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃতের শতকরা ৮৬ ভাগ শিকার হন পথচারী। গবেষণায় আরো উল্লেখ করা হয়েছে যে, দুর্ঘটনার শিকার অর্ধেক মানুষ বাসের জন্য অপেক্ষারত অবস্থায়, রাস্তা পারাপারের সময় অথবা ফুটপাত ব্যবহার না করে রাস্তা দিয়ে হাঁটার কারণে দুর্ঘনায় পতিত হয়েছেন।

ঐ একই গবেষণায় ৫০০ জনকে প্রশ্নমালা দিয়ে প্রাপ্ত উত্তর পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে, ওভারপাস ব্যবহারকে তারা কালক্ষেপণ বলে দেখিয়েছেন।

মামা, এই কালক্ষেপণ বিষয়ে কিছুদিন আগে শ্যামলীতে হাত উঁচিয়ে রাস্তা পার হওয়ার পর শাড়ি পরিহিত এক নারী পথচারীকে ফুটওভারপাস ব্যবহার না করে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, আমার তাড়া আছে- তাই তিনি ৩০/৪০টি সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে ফুটওভারপাস ব্যবহার করেন নাই।

অপর একজন নারী পথচারী অভিযোগ করেন যে, ফুটওভারপাসে হকার/উত্ত্যক্তকারীদের দৌরাত্ম্য থাকায় তিনি তা ব্যবহার করেন না।

তাহলে মামা, আজ কি শুধু সমস্যার কথাই উঠবে- এর কোনো সমাধানের পথ কি বেরুবে না? মামা বলেন, ভাগ্নে, এই ফুট ওভারপাস কনসেপ্ট অনেক পুরোনো। এর থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কেননা দিল্লীসহ পৃথিবীর অনেক বড় বড় জববহুল শহরে ফুটওভারপাস নেই বললেই চলে। আছে শুধু আন্ডারপাস। অথচ ঢাকায় ওভারপাস আছে ৭৪টি- কিন্তু আন্ডারপাস আছে মাত্র ০৩টি।

মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং অনেকের শারীরিক অসুস্থতা যেমন কোমরে ব্যথা, হাঁটুতে ব্যথা, হাতে ব্যথা ইত্যাদি নানা উপসর্গ, তার উপর অনেক নারী পথচারীদের কোলে থাকা শিশু ৩০/৪০টি সিঁড়ি ভেঙে ফুটওভারপাস দিয়ে রাস্তা পারাপারের পথে একটি বড় অন্তরায় বটে।

মানুষ সবসময় শর্টকাট খোঁজে, বিশেষ করে রাস্তা চলাচলের ব্যাপারে সে আরো শর্টেস্ট পসেবল ওয়ে খুঁজে বেড়ায়। আর তাই পুলিশ দিয়ে তাকে সাময়িকভাবে ওভারপাসে উঠানো গেলেও মনের দিক থেকে রাস্তা পারাপারে আন্ডারপাস ব্যবহারেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে বলে আমি মনে করি। বিষয়টা একটা সহজ সমীকরণের মতো। ৩০/৪০টি সিঁড়ি ভেঙে ওভারপাসে ওঠার চেয়ে আন্ডারপাসের ১০/১৫টি সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামা এতটা স্বস্তিকর যে মানুষ আন্ডারপাস ব্যবহারের সময় নিচে নেমে ওপরে ওঠার ক্লেশটুকু মনেই রাখতে পারে না।

আর তাইতো আন্ডারপাস 'ইউজার ফ্রেন্ডলি'।

মানুষের মনস্তত্ত্বের এই বিশ্লেষণে তাই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, 'মানুষ কি লোহার কল যে ঠিক নিয়ম অনুসারে চলবে? মানুষের মনের এতো বিচিত্র এবং বিস্তৃত কা-কারখানা- তার এতদিকে গতি- এবং এতরকমের অধিকার যে, এদিকে ওদিকে হেলতেই হবে। এটাই তার জীবনের লক্ষণ, তার মনুষ্যত্বের চিহ্ন, তার জড়ত্বের প্রতিবাদ।'

থ্যাংকিউ মামা, আপনার ভাগ্নে বৌ ডিনার নিয়ে অনেকক্ষণ বসে আছে, আজ আর নয়। খোদা হাফেজ।

মো. জিয়াউল হক কামাল : লেখক

এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আনার মতামত দিন।
মতামত দিতে চাইলে অনুগ্রহ করে করুন।
আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন।
সর্বাধিক পঠিত
ফটো গ্যালারি
আজকের পত্রিকা
আজকের নামাজের সময়সূচীসেপ্টেম্বর - ১৬
ফজর৪:২৯
যোহর১১:৫৪
আসর৪:১৯
মাগরিব৬:০৫
এশা৭:১৮
সূর্যোদয় - ৫:৪৫সূর্যাস্ত - ০৬:০০
পুরোন সংখ্যা
বছর : মাস :
আজকের পাঠকসংখ্যা
৫৯২১.০
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতিঃ সৈয়দ এম. আলতাফ হোসাইন। সম্পাদক : আহ্সান উল্লাহ্। উপদেষ্টা সম্পাদক : মোঃ শাহাবুদ্দিন শিকদার। প্রকাশক ছৈয়দ আন্ওয়ার কর্তৃক রোমাক্স লিমিটেড, তেজগাঁও শিল্প এলাকা থেকে মুদ্রিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : খলিল ম্যানশন (৩য়, ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলা), ১৪৯/এ, ডিআইটি এক্সটেনশন এভিনিউ, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত। ফোন : ৯৩৫৭৭৩০ (বার্তা), ৮৩১৫৬৪৯ (বাণিজ্যিক), ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪.
ই-মেইলঃ djanata123@gmail.com, bishu.janata@gmail.com
ফোনঃ ০২৮৩১৫১১৫, ০২৮৩১৫৬৪৯ ফ্যাক্সঃ ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪
Copyright The Dainik Janata © 2010 Developed By : orangebd.com.