নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা, শুক্রবার ৩১ জুলাই ২০২০, ১৬ শ্রাবণ ১৪২৭, ৯ জিলহজ ১৪৪১
শতবর্ষ আগের কোরবানি ও বর্তমান ঈদ-উল-আজ্হা
মোঃ জোবায়ের আলী জুয়েল
মুসলমান জনগোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ দুটি ধর্মীয় উৎসব হচ্ছে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। আমাদের দেশে এই ধর্মীয় উৎসব দুটি যথেষ্ট ধুমধামের সঙ্গে পালিত হতে দেখা যায়।

উনিশ শতকের শুরু থেকেই যখন রাজনৈতিকভাবে মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদী আন্দোলন শুরু হয়েছিল তখন থেকেই গুরুত্ব পেয়েছে ঈদ। তবে খানিকটা জাঁকজমকের সঙ্গে দুটো ঈদ পালনের মধ্যে আছে বিত্তের সম্পর্ক। স্বাভাবিকভাবেই শহরে, মফস্বলে ও গ্রামঞ্চলে যারা ধনী, বিত্তবান তাদের ঈদ আর সাধারণ মানুষের ঈদের মধ্যে রয়েছে বিস্তর পার্থক্য। ইসলাম প্রচারের শুরুতে অর্থাৎ আদিতে বাঙালি মুসলমানরা কিভাবে ঈদ পালন করতেন তা জানা আজ অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার। আমরা এখানে একশ' বছর আগে বাংলাদেশে কিভাবে কোরবানির ঈদ পালন করা হতো তারই কিঞ্চিৎ বর্ণনা তুলে ধরার চেষ্টা করবো। আমরা এ কথা নিঃসংশয়ে বলতে পারি, অতীতে মুসলমানদের ঈদুল ফেতর যেমন বাংলাদেশে বড় কোনো ধর্মীয় উৎসব পালিত হয়নি তেমনি পালিত হয়নি ঈদুল আজহাও। আজকে আমরা স্বতস্ফূর্তভাবে আনন্দের সঙ্গে ধুমধামের সঙ্গে ঈদুল আজহা উদযাপন করি তা মাত্র ষাট-সত্তর বছরের ঐতিহ্য মাত্র। ঈদুল আজহা যুক্ত পবিত্র হজব্রতের মাধ্যমে।

মুসলমানরা কেন কোরবানি দেয় এবং এর তাৎপর্য ও উৎসই বা কি? এ কথার বিশেষ বর্ণনা দেয়ার প্রয়োজন নেই বলে মনে করি। প্রতিটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানের সে কথা জানা। পবিত্র কোরআনের সূরা সাফ্ফাতে বলা হয়েছে যখন পিতার সঙ্গে (ইব্রাহিম আ:) কাজ করার মতো বয়স হলো তখন তার পিতা ইব্রাহিম (আ:) বললেন- 'হে প্রাণাধিক পুত্র, আমি স্বপ্নে আল্লাহর নির্দেশ পেয়েছি আমার প্রিয় বস্তুকে (ইসমাঈলকে) জবেহ করা। এতে তোমার কি কিছু বলার আছে? ইসমাঈল বললো 'হে আমার পিতা! আপনাকে আল্লাহর নিকট থেকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তাই করুণ। যখন তারা পিতা-পুত্র উভয়েই আনুগত্য প্রকাশ করলো ও ইব্রাহিম (আঃ) যখন তার পুত্র কে আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক জবাই করার জন্য কাত করে শুইয়ে দিলেন তখন স্বয়ং আল্লাহ তাকে (ইব্রাহিম) ডেকে বললেন, হে ইব্রাহিম! তুমি তোমার প্রভুর স্বপ্নের আদেশ পালন করেছো। আমি তোমার প্রতি সন্তষ্ট। এটা ছিল তোমার এক স্পষ্ট ঈমানের পরীক্ষা। আমি তাকে ছাড়িয়ে নিলাম এক পশু কোরবানির বিনিময়ে।

আরো বলা হয়েছে সূরা হজ্বে আমি প্রত্যেক সমপ্রদায়ের জন্য কোরবানির নিয়ম ওয়াজিব করে দিয়েছি যাতে তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী হালাল চতুস্পদ পশু আল্লাহর নামে জবেহ করতে পারো। আবার এটাও তোমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি যে- আল্লাহর কাছে ওদের (পশুর) মাংস, রক্ত পৌছায় না। বরং তোমাদের নিয়ত ও ধর্মনিষ্ঠা পৌছায়। তাই এই ঈদ উজ জোহার পশু উৎসর্গের ব্যাপারটি হজ্বের সঙ্গে এটি অবশ্যই মুসলমানদের জন্য পালনীয় কর্তব্য।

ঈদ উজ জোহা আমাদরে মুসলিম সমপ্রদায়ের কোরবানির ঈদ, বকরী ঈদ নামেই সমধিক পরিচিত। অনেকেরই ধারণা সূরা বাকারা থেকে বকরী শব্দটির উদ্ভব হয়েছে, একথা ঠি'ক নয়। মূলত ঈদের সঙ্গে এর কোন সম্পর্ক নেই। তাছাড়া বকরী মানে আমরা নিদিষ্ট একটি পশু-ছাগল অথবা খাসিকেই বুঝে থাকি।

একশ' বা দেড়শ' বছর আগে বাংলাদেশে গরু কোরবানী দেয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। কোরবানি যদি কেউ দিতেন তাহলে খাসি বা ছাগলই দিতেন। বকরা' শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো গাভী। বকরা আরবি শব্দের বিকৃত রূপ নিয়েছে বকরী। কিন্তু সে সময়ে গরু যেহেতু কোরবানি দেয়া সম্ভবপর ছিল না। কোরবানি দেয়া হতো ছাগল তাই বকরী মানে দাড়িয়ে গেছে ছাগল।

তৎকালীন বিখ্যাত সাহিত্যিক রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমেদ তার আত্নজীবনীতে সে সময়ে ঈদ উজ জোহা সম্পর্কে বর্ণনা দিয়েছেন 'বকরা' ঈদে কেউ গরু কোরবানি করিতো না। সে আমলে পরাক্রমশালী জমিদারদের তরফ থেকে গরু কোরবানী কড়াকড়িভাবে সর্বত্রই নিষিদ্ধ ছিল। শুধুমাত্র বকরী কোরবানি করা চলিত। লোকেরা করিতও প্রচুর।

মোগল যুগে বাংলাদেশে ঈদুল আজহা কিভাবে পালন করা হতো তা জানা যায় নি। এমনকি উনিশ শতকের প্রারম্ভে ঈদুল আজহার তোমন কোন বিবরণ আমরা পাই না।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে একশ' দেড়শ' বছর আগে ঈদ মুসলমানদের প্রধান উৎসব হিসেবে তেমনভাবে পালিত না হওয়ার মূল কারণ ছিল সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না পাওয়া। বিত্তহীনতা, দারিদ্র্য প্রভৃতির কারণে মানুষের স্বতস্ফূর্ত আশা আকাঙ্ক্ষার স্ফুরণ না ঘটা। আবুল মনসুর আহমেদ তার আত্নজীবনী গ্রন্থে আরো জানিয়েছেন, 'দুটি ঈদেরই প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল মাঠে গিয়ে নামাজ পড়া এবং তারপর আত্নীয়-স্বজন নিয়ে উৎকৃষ্ট আহার করা। মুহরম পর্বে আমাদের বাড়িতে এতো ধুমধাম হলেও দুই ঈদে তেমন কোন উৎসব পালন করা হতো না। বকরী ঈদ প্রথম প্রথম দুই, তিনটা ও পরে মাত্র একটা গরু কোরবানি হতো। এটি ছিল উনিশ শতকের প্রারম্ভের কথা। সেকালে বিশুদ্ধ ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল সাধারণ মানুষ। এ অবস্থার পরিবর্তন এনেছিল ফরায়েজী আন্দোলন (১৮১৫ খ্রি.)। এর আগে ইসলাম ধর্মে লোকজ উপাদানের অধিপত্য ছিল বেশি। অনেক ক্ষেত্রে হিন্দু রীতিনীতির। এখনও যে একেবারে নেই তা নয়। তবে ফরায়েজী আন্দোলন সারা বাংলায় সৃষ্টি করেছিল প্রবল বাধাবিপত্তি। এ সময়ই বিশুদ্ধ ইসলাম সম্পর্কে মুসলমানদের মধ্যে ধ্যান-ধারণা স্পষ্ট হতে থাকে। আশি নব্বই বছর আগেও এই বাংলায় কোরবানি নিয়ে লোকের মধ্যে তেমন কোন মাথাব্যাথা ছিলনা। এরপর আসে গরু কোরবানির কথা। মুসলমান ধর্মে কোরবানির (গরু) বিধান আছে। কিন্তু গোড়ামি, কুসংস্কারের কারণে তা হতো না। তাছাড়া সে আমলে হিন্দু জমিদারদের দাপটে স্বভাবতই বাংলাদেশে গরু কোরবানি দেয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। কিন্তু এ অবস্থা বেশি দিন চলেনি। ফরায়েজী আন্দোলন, তিতুমির আন্দোলন, বিভিন্ন ধর্ম প্রচারকদের প্রচার, ওয়াজ মাহফিল আঞ্জুমানসমূহের কার্যকলাপের ফলে এ ধরনের অনেক সংস্কার বিলুপ্ত হয়েছিল। মুসলমানদের মন থেকে তখন থেকেই কোরবানি বিশেষ করে ঈদ-উদ-জোহার গরু কোরবাণী ব্যাপারটি বাংলায় এক বিতর্কিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

আজকে আমরা বাংলাদেশে ঈদ-উজ-জোহায় অনায়াসে গরু বা ছাগল কিনে এসে সহজেই কোরবানি দিয়ে ফেলি। নব্বই একশ' বছর দূরে থাকুক সত্তর আশি বছর আগেও কোনোক্রমেই তা এতো সহজ সাধ্য ব্যাপার ছিল না। এর জন্য সে সময় সারা বাংলায় ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের রীতিমতো আন্দোলন করতে হয়েছে। আজকের প্রজন্ম হয়তো অবাক হবেন এ নিয়ে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর ধরে সারা বাংলায় বিতর্ক চলেছে এবং কোরবানি বিশেষ করে গরু কোরবানি দেয়ার অধিকার আমাদের পিতা, পিতামহদের হিন্দুদের সঙ্গে লড়াই করে আদায় করতে হয়েছে। হিন্দুরা তো বটেই অনেক ক্ষেত্রেই মুসলমানদেরও সংস্কার ছিল গরু জবাইয়ের বিপক্ষে। সে সময় হিন্দু জমিদারদের আভিজাত্য ও দোর্দন্ড প্রতাপ ছিল সর্বত্রই। এর ফলে সে আমলে গরু জবাই ছিল অসম্ভব। এর সঙ্গে সমপ্রদায়গত মান-অভিমানের ব্যাপারটিও ছিল যুক্ত, ফলে বিষয়টি নিয়ে সারা বাংলায় তুমুল বিতর্ক হয়েছিল এবং প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে এ বিতর্ক বিভিন্ন সমসাময়িক পত্র পত্রিকায় ছড়িয়ে পড়েছিল।

১৮৮২ সালে দয়ানন্দ সরস্বতী 'গো-হত্যা নিবারণী' সভা শুরু করে, এর বিপক্ষে ভারতবর্ষ জুড়ে চালিয়েছিলেন প্রবল প্রচার। ১৮৮৭ সালে রাজশাহীর তাহিরপুরের জমিদার শশি শেখর রায় কংগ্রেসের মাদ্রাজ অধিবেশনে গরু কোরবানির বিপক্ষে উত্থাপন করেছিলেন প্রস্তাব। ফরিদপুর ও বিভিন্ন অঞ্চলেও শুরু হয়েছির এর বিপক্ষে প্রচার। হিন্দু জমিদাররাও এ বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বিভিন্ন ধর্মীয় সভা ও আঞ্জুমানসমূহ এগিয়ে এসেছিল এর প্রতিবাদে। একজন মুসলমান সমাজ সংস্কারক সে সময় লিপিবদ্ধ করেছিলেন মুসলমানদের দুঃখদুর্দশার চিত্র। এখানে হুবহু তুলে ধরা হলো- তিনি লিখেছিলেন 'গাবিন্দপুর, হরিশংকরপুর, সনাতনী, গোপীনগর সর্বত্রই হিন্দু জমিদারদের দোর্দ- প্রতাপে সেখানকার মুসলমানগণ বহুকাল অবধি গরু কোরবানি করিতে বা গরু জবাই ও উহার মাংস ভক্ষণ করিতে পারিত না। কেউ তা করিলে জমিদার কাছারীর দুর্দান্ত হিন্দু নায়েবগণ তাহাদের ধরিয়া আনিয়া চাবুকের কষাঘাতে জর্জরিত করিত। হিন্দু জমিদারদের অত্যাচারে ওই অঞ্চলগুলিতে গো-কোরবানী প্রথা উঠিয়া গিয়াছিল।'

১৮৯৬ সালে ময়মনসিংহের অম্বরিয়া, মুক্তাগাছা ও সন্তোষের জমিদারগণ ঈদ-উজ- জোহার গরু কোরবানির জন্য তাদের গ্রামের বেশ কিছু মুসলমানদের জরিমানা করেছিলেন। ১৯০৫ সালে কুমিল্লার চাঁদপুর কয়েকজন মুসলমান গরু কোরবানি দেয়ায় জনৈক প্রভাবশালী হিন্দু গোপাল চন্দ্র মজুমদার তাদের বিরুদ্ধে কোর্টে মামলা দায়ের করেছিলেন। অভিযোগ ছিল মুসলমানরা প্রকাশ্য মাংস ধুয়ে জল অপবিত্র করছে। সে সময়ে জেলা হাকিম ছিলেন জগদিশ চন্দ্র সেন। তিনি বিচারে তিনজন মুসলমানকে অভিযুক্ত করে একজনকে এক মাসের কারাদ- এবং অপর দু'জনকে যথাক্রমে পঞ্চাশ ও ষাট টাকা জরিমানা করেছিলেন (ওয়াকিল আহমেদের কোরবানি বিষয়ক গ্রন্থ-পৃষ্ঠা ৪২) উনিশ শতকের শেষার্ধে কোরবানি বিশেস করে গরু জবেহ বিতর্কটি ভিন্নমাত্রা সংযোজিত হলো যখন প্রখ্যাত মুসলিম সাহিতত্যিক বিষাদ সিন্ধু রচয়িতা মীর মশারফ হোসেন গরু কোবরানীর বিপক্ষে হিন্দুদের পক্ষাবলম্বন করলেন। তৎকালীন 'আখবারে এসলামিয়া' সম্পাদক মৌলভী নঈমুদ্দীন এরই বির্তকে মুসলমানদের পক্ষাবলম্বন করেন। মীর মশারফ হোসেনের যুক্তি ছিল হিন্দু-মুললিম ঐক্য বিনষ্টকারী গরু জবেহ বা গরু কোরবানি দুই ধর্মের ঐক্যের পরিপন্থী হয়ে দাঁড়াচ্ছে সুতারাং মুসলমানদের গরু জবেহ না করলে ঐক্য বিনষ্টকারী প্রধান মাধ্যমটি উৎপাটিত হয়ে যায়। এই পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি তৎকালীন 'আহমদীতে' লিখেছিলেন- 'গোকুল নির্মূল আশঙ্কা' নামে একটি প্রবন্ধ আরও দু'টি প্রবন্ধ 'গো-ধন কি সমান্য ধন' ও 'গোমাংস ও গো দুগ্ধ' লিখেছিলেন। এই প্রবন্ধগুলো একত্রিত করে তিনি তাঁর গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন 'গো জীবন' (১৮৮৯ খ্রি.)।

গরু কোরবানি ও গরুর মাংস ভক্ষণের পক্ষে সেই সময় মীর মশারফ হোসেনের বিরুদ্ধে এগিয়ে এসেছিলেন তৎকালীন মৌলভী নঈমুদ্দীন। তিনি ছিলেন টাঙ্গাইল থেকে প্রকাশিত 'মাসিক আখবার এসলামিয়ার' সম্পাদক (১৮৮৮ খ্রি.) তিনি এক জনসভায় তৎকালীন মীর মশারফ হোসেনকে 'কাফের' ও তাঁর স্ত্রীকে হারাম বলে ঘোষণা করেছিলেন। কাফের ঘোষণার প্রতিবাদে মীর মশারফ হোসেন মৌলভী নঈমউদ্দীনের বিরুদ্ধে সেকালে মানহানির মামলা দায়ের করেছিলেন কোর্টে। আখবার ও নঈমউদ্দীনের পক্ষে ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে এগিয়ে এসেছিলেন জগন্নাথ, জুবিলী এবং নর্মাল স্কুলের ছাত্ররা। ঢাকায় ছাত্ররা গরু কোরবানির পক্ষে আয়োজন করেছিলেন বিরাট সভার। পরে দু'পক্ষের ভুল বোঝাবুঝিতে ধর্মীয় মুসলমান আলেমদের সমঝোতায় মামলায় আপোষরফা হয়েছিল।

এর পরবর্তীতে ১৯১০ সালে সংবাদে জানা যাচ্ছে বাংলাদেশে গরু কোরবানিতে বাধা দিচ্ছেন স্থানীয় হিন্দু জমিদাররা। তৎকালীন মাসিক বাসনা (১৯০৮ খ্রি.) লিখেছিলেন- অনেক জমিদার কোলকাতার 'গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলে' খানা খাইত পারেন কিন্তু আপন জমিদারির মধ্যে মুসলমান প্রজাদিগকে তাহাদের ধর্মকর্ম (কোরবানী) করিতে দেন না। যতদিন হিন্দু জমিদারগণ প্রাকাশ্যভাবে মুসলমানদের ধর্ম-কর্মে কুরবানিতে বাধা দিবে ততোদিন কোনো ঐক্য স্থাপিত হবে না।' এভাবেই তৎকালীন মুসলমান সমাজকে বহু ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে সংগ্রাম করে হিন্দু জমিদারদের কাছ থেকে বহু বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে আমাদের মুসলমানদের ঈদ-উজ-জোহার গরু কোরবানিকে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়েছে। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে ঈদ-উজ-জোহা মুসলমানদের রাষ্ট্রীয় ধর্মীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর বিত্তবান ও বিত্তহীনদের তফাৎ চোখে লাগবার মতো প্রকট হয়ে উঠেছে। তাই আমরা দেখতে পাচ্ছি কোরবানি এখন ব্যবহৃত হচ্ছে সামাজিক মর্যাদা সূচক প্রতীক হিসেবে। গ্রামে এখনও কোরবানি সীমাবদ্ধ অর্থের অভাবে। ধনীরা যারা শহরে বাস করেন তারা স্বতস্ফূর্তভাবে খাসি ও গরু দুটোই কোরবানি দেন, কোরবানির প্রকৃত তাৎপর্য ও ফজিলত না জেনেই এবং বোধ করি সেটা খোদাকে ভালোবেসে নয়, ধর্মের কথা ভেবে নয়, বরং প্রতিবেশীদের দেখানো যে আমি প্রচুর টাকার গরু কিনে কোরবানি দিচ্ছি। জানি না আল্লাহ এটাকে কোনভাবে দেখবেন। গরু কেনা নিয়ে রয়েছে মুসলমানদের মধ্যে অর্থের ও বিত্তবৈভবের প্রতিযোগিতা। ধর্ম ব্যবহৃত হচ্ছে প্রতিপত্তি ও অর্থ প্রদর্শনের হাতিয়ারের প্রতীকরূপে। ধর্মভিত্তিক দলসমূহ এবং প্রভাবশালী বিত্তবান কর্ণধাররা বিশুদ্ধ ইসলাম সম্পর্কে আমাদের প্রতিদিন এতো নসিহত করেন। কিন্তু এই অপচয়, এই অশ্লীল অর্থ প্রদর্শনের বিরুদ্ধে নিশ্চুপ। কারণ সমাজে তারা এদের মদদ যোগান এবং তাদের প্রয়োজনে।

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ আগেও যেমন বঞ্চিত ছিলেন ঈদের আনন্দ থেকে এখনো বঞ্চিত আছে তদ্রূপ প্রতিনিয়ত। মোগল আমলের ইতিহাসে আমরা দেখেছি- বিত্তবানরা ঈদের দিন ছুঁড়ে দিচ্ছেন রেজগী পয়সা আর সাধারণ, নিরন্ন বঞ্চিত মানুষ তা কুড়িয়ে নিচ্ছেন কাড়াকাড়ি করে। এখানো তার এ আমলে কোনো হেরফের হয়নি, বরং বঞ্চনা আরো বেড়েছে। আমরা চোখের সামনে দেখছি বাংলাদেশে সৌদি আরবের কোরবানির মাংস নেয়ার জন্য হুটোপুটি, লাইনে তা আমাদের হতভাগ্য, বঞ্চিত, দরিদ্র, নিপীড়িত মানুষের চেহারাই তুলে ধরে। সুতরাং ঈদ-উজ-জোহার আনন্দ সাধারণ মানুষের মনে আজ আর কোনই রেখাপাত করে না।

ঈদ-উজ-জোহার জামায়াত থেকে ফিরে এসে বিত্তবানদের দেয়া মাংসের জন্য অপেক্ষা করতে হয় শত শত ছিন্নমূল মানুষদের। উৎসব সর্বাঙ্গীন আনন্দময়, স্বতস্ফূর্ত হয়ে ওঠে তখনই যখন আসে বিত্তবন্টের সামঞ্জস্য। তা না হলে ধর্মীয় উৎসবের ও (ঈদ-উজ-জোহার) মূল আবেদন হরাস পায়। ধর্ম তো পালন কোনোক্রমেই হয় না বরং ধর্ম ব্যবহৃত হয় শুধু আত্নপ্রদর্শনের হাতিয়াররূপে।

ঈদ-উজ-জোহা আমাদের জীবনে বয়ে নিয়ে আসুক অনাবিল প্রীতি, আনন্দ, মুসলিম ভাতৃত্ববোধ ও আত্নত্যাগের বিরাট এক মহিমান্বিত গৌরবদীপ্ত উদ্ভাসিত জীবন।

মো: জোবায়ের আলী জুয়েল : লেখক

এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আনার মতামত দিন।
মতামত দিতে চাইলে অনুগ্রহ করে করুন।
আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন।
সর্বাধিক পঠিত
ফটো গ্যালারি
আজকের পত্রিকা
আজকের নামাজের সময়সূচীআগষ্ট - ১১
ফজর৪:১১
যোহর১২:০৪
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৩৮
এশা৭:৫৬
সূর্যোদয় - ৫:৩২সূর্যাস্ত - ০৬:৩৩
পুরোন সংখ্যা
বছর : মাস :
আজকের পাঠকসংখ্যা
১২৫৭৯.০
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতিঃ সৈয়দ এম. আলতাফ হোসাইন। সম্পাদক : আহ্সান উল্লাহ্। প্রকাশক ছৈয়দ আন্ওয়ার কর্তৃক রোমাক্স লিমিটেড, তেজগাঁও শিল্প এলাকা থেকে মুদ্রিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : খলিল ম্যানশন (৩য়, ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলা), ১৪৯/এ, ডিআইটি এক্সটেনশন এভিনিউ, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত। ফোন : ৯৩৫৭৭৩০ (বার্তা), ৮৩১৫৬৪৯ (বাণিজ্যিক), ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪.
ই-মেইলঃ djanata123@gmail.com, bishu.janata@gmail.com
ফোনঃ ০২৮৩১৫১১৫, ০২৮৩১৫৬৪৯ ফ্যাক্সঃ ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪
Copyright The Dainik Janata © 2010 Developed By : orangebd.com.