নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা, শনিবার ১০ আগস্ট ২০১৯, ২৬ শ্রাবণ ১৪২৬, ৮ জিলহজ ১৪৪০
শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ চাই
শেখ আনোয়ার
চুল পেকেছে। চেহারায় বয়সের ছাপ স্পষ্ট। তাই বলে কানে কম শুনবেন কেন? না, এটি হতে পারে না। এটি আমাদের ভুল ধারণা। কানে কম শোনা শুনির সঙ্গে বয়সের কোনোই সম্পর্ক নেই। আমার কথা নয়। বলেছেন বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞানীদের মতে, 'কানে কম শোনা' এক ধরনের রোগ। বিশেষজ্ঞদের কাছে যার স্থায়ী চিকিৎসা নেই। রয়েছে কেবল প্রতিরোধের উপায়।

দৃশ্যপট: ১। ক্যাথি প্যাক। গানবাজনা করেন। কান নিয়ে কখনো কোনদিন ভাবনা চিন্তার দরকারই মনে করেননি মার্কিন এই শিল্পী। ব্যান্ডের তালে তালে বেইস গিটার বাজান। এটিই তার পেশা। পাঁচ বছর পর আসল মজাটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়ে গেলেন এই শিল্পী। শব্দের চোটে এখন কান দু'টো তার ড্যামেজ। কিছুই শুনতে পাচ্ছেন না। স্থায়ী বধির হয়ে গেছেন তিনি ।

দৃশ্যপট: ২। প্রাংক গোরাল। নৌবাহিনীর ফ্লাইট অফিসার। কে জানে যে তিনিও বধির হয়ে যাবেন? জেট ইঞ্জিনের শব্দ তার কান দু'টো ছাই ভস্ম করে দেবে, কে জানতো? ফ্লাইট অফিসার হিসেবে মাত্র পাঁচ বছর চাকরি করেছেন। কানের স্থায়ী সমস্যার কারণে ফ্লাইট ছেড়ে তিনি এখন অফিসিয়াল কাজ নিয়েছেন। তবে ইতোমধ্যে যা হবার তা তো হয়েই গেছে। মানে তার কান দু'টো এখন প্রায় ফিউজ। শব্দ দূষণের জন্য কান নিয়ে আক্ষেপ করে তিনি বলেন, 'আমার মনে হয়, ডানে বায়ে কেউ কিছু বলছে। কিন্তু কি বলছে? পাশের লোককে প্রায়ই প্রশ্ন করি। উনি কি কিছু বলেছেন? এটি আমার এখন বাজে অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে।'

শব্দদূষণ কি?: শব্দদূষণ বলতে মানুষের বা কোনো প্রাণীর শ্রুতিসীমা অতিক্রমকারী শব্দ সৃষ্টির কারণে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনাকে বোঝায়। যানজট, কলকারখানা থেকে দূষণ সৃষ্টিকারী এরকম তীব্র শব্দের উৎপত্তি হয়ে থাকে। বিমানের প্রচ- আওয়াজের ফলে বিমানবন্দর এলাকার আশপাশে ব্যাপক শব্দ দূষণগত পরিবেশের সৃষ্টি করে। রাতে এবং ভোরে যদি বিমান পরিচালনা করা হয় তখন ব্যক্তির ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। শুধুমাত্র অবতরণ কিংবা উড্ডয়নের জন্যই বিমানের আওয়াজ সৃষ্টি হয় তা কিন্তু নয়। বিমান মেরামত ও পর্যবেক্ষণের জন্যও এরূপ হয়ে থাকে। এর ফলে ব্যক্তি, বিশেষত শিশুর শব্দদূষণগত কারণে শারীরিক এবং মানসিক বিকাশেও ব্যাপক ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করে থাকে।

বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে জানিয়েছেন, মাত্রাতিরিক্ত শব্দ দু'কানের বারোটা বাজায়। উইলিয়াম ক্লার্ক, সেইন্ট লুইম বধির সংস্থার বিশিষ্ট দুই বিজ্ঞানী। তারা বলেন, 'আমেরিকানদের অনেকেই এখন কানে কম শুনেন। যার ৭৫ শতাংশ শব্দ দূষণের শিকার।' শব্দ কি ভয়ঙ্করভাবেই না শ্রবণশক্তি নষ্ট করে, ধারণাই করা যায় না। দু'ভাবে কানের ক্ষতি করে শব্দ। তাৎক্ষণিক এবং ধীরে ধীরে। তাৎক্ষণিক ক্ষতিকে বলে অ্যাকোস্টিক ট্রমা। বন্দুকের গুলির মতো শক্তিশালী। এই উচ্চগ্রাম শব্দ কান দুটো এফোঁড় ওফোঁড় করে দেয়।

ধীরে ধীরে শব্দ দূষণের শিকার আমরা প্রত্যেকেই। নগর জীবনের নানান শব্দ আমাদের কান ঝালাপালা করছে। ধীরে ধীরে ধ্বংস করছে কানের ভেতরের ইন্দ্রিয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের কানের ভেতরে বা অন্তকর্ণে ষোল হাজার সেল বা কোষ থাকে। এগুলো মস্তিষ্কে শব্দের অনুভূতি জাগায়। প্রতিনিয়ত এ কোষগুলোই মারা যাচ্ছে উচ্চ শব্দ সইতে না পেরে। এবার ধরা যাক-জীবন জন্তুর গজর্ন, চিৎকার, মানুষের চিৎকার, গাড়ির হর্ন, গিটার বা বাঁশির শব্দ, ঢোল-ঢাকের বাদ্য বাজনা, অডিও ইত্যাদির কথা। এসবই উচ্চ গ্রামের শব্দ কম্পাংক তোলে। এসব শব্দের আঘাতে আমাদের কান থেকে রক্তপাত দৃশ্যমান হয় না বটে। কিন্তু শ্রবণ ইন্দ্রিয় ধ্বংস করে খুবই নীরবে।

শব্দের ক্ষতিকর মাত্রা: শব্দের একককে বলে ডেসিবল। সংক্ষেপে ডিবি। ৮৫ ডিবি শব্দ আমাদের কানের জন্য নিরাপদ। ওয়াশিং মেশিন, ভ্যাকিউম ক্লিনার ইত্যাদির শব্দ ৮৫ ডেসিবল। কিন্তু এর বেশি হলেই কান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাওয়ার ড্রিলের শব্দ ১শ ডিবি। দু'ঘণ্টা এক নাগাড়ে এই শব্দ শুনলে কান হবে একদম শেষ। অডিও-ভিডিওর শব্দ সাধারণ মাত্রায় ১১০ ডিবি থাকে। শিশুদের চিৎকারের শব্দ ৯০ ডিবি, ঘড়ির এলার্ম ৮০ ডিবি আর পথঘাটের এলোমেলো শব্দ ধ্বনি ১শ ডেসিবলের ঊধর্ে্ব থাকে। বন্দুকের গুলির শব্দ ১৪০ ডেবিবেল। হাতুড়ি পেটার শব্দ ১৩০ ডিবি। ৩.৮ মিনিট এই শব্দ শুনলেই কানে ঝিম ধরে যায়। ব্যান্ড মিউজিক ১২০ ডিবি। ৭.৫ মিনিটের বেশি শুনলেই কানের কেল্লাফতে। পাওয়ার ড্রিলিং মেশিন ১০০ ডিবি। মাত্র দু' ঘণ্টা শুনলে কান ভোঁতা হয়ে যায়। ঘাস কাটার যন্ত্র ৯০ ডিবি। ৮ ঘণ্টার বেশি শোনা যায় না। গবেষকরা জানিয়েছেন: মানুষ সাধারণত ২০-২০,০০০ হার্জের কম বা বেশি শব্দ শুনতে পারে না। মানুষের কান যেকোনো শব্দের ব্যাপারে যথেষ্ট সংবেদী। তাই তীব্র শব্দ কানের পর্দাতে বেশ জোরে ধাক্কা দেয়, যা কানের পর্দাকে নষ্টও করে দিতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে এর ক্ষতিকর প্রভাব সুদূর প্রসারী হয়ে থাকে। শব্দদূষণের কারণে মানুষের স্বাস্থ্য এবং আচার-আচরণ সব ক্ষেত্রেই সমস্যার সৃষ্টি করে থাকে। অতিরিক্ত শব্দের কারণে মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাভাবিক কার্যকলাপ ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এছাড়াও শব্দদূষণের কারণে দুশ্চিন্তা, উগ্রতা, উচ্চ রক্তচাপ, শ্রবণশক্তি হরাস, ঘুমের ব্যাঘাতসহ অন্যান্য ক্ষতিকর ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া ঘটতে পারে।

ঢাকা শহরে শব্দ দূষণ: ঢাকা শহরে অসহনীয় শব্দের সঙ্গে আমরা বসবাস করছি। রাস্তায় নামলে গাড়ি, মোটরসাইকেল আর নানান ধরনের যানবাহনের শব্দে মানুষ দিশাহারা হয়ে যায়। আবাসিক-অনাবাসিক এলাকা, অফিসপাড়া, বিপণি বিতান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এমনকি হাসপাতালের আশপাশেও শব্দ দূষণের তীব্রতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। যা জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। তাই শব্দ দূষণের মতো মারাত্মক ঘাতক সম্পর্কে সর্ব সাধারণের সচেতন হওয়া জরুরি প্রয়োজন।

শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন: ২০০৬ সালের শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা অনুযায়ী, কোথাও কোনো হাসপাতাল থাকলে সেটি 'নীরব এলাকা' হিসেবে চিহ্নিত হবে। আর 'নীরব এলাকায় চলাচল করার সময় যানবাহনে কোনো প্রকার হর্ন বাজানো যাবে না'। বিধি অনুযায়ী, নীরব এলাকায় হর্ন বাজালে প্রথমে এক মাসের কারাদ- পঁচ হাজার টাকা জরিমানা। আবার নিয়ম ভাঙলে ছয় মাসের কারাদ- জরিমানা করা হবার কথা। কিন্তু আইনের এই প্রয়োগ হয় না বললেই চলে।

পরিবেশ অধিদফতর তাদের সাম্প্রতিক জরিপে আটটি বিভাগীয় শহরের ২০৬টি স্থানের শব্দ পরিমাপ করে। এই স্থানগুলোতে ১৩০ ডেসিবেল পর্যন্ত আকস্মিক শব্দের মাত্রা রেকর্ড করা হয়। কোনো কোনো স্থানে মাত্র ১০ মিনিটে ৯০০ বারের অধিক হর্ন বাজতে দেখা যায়। অতিরিক্ত হর্ন বাজানো এসব স্থানে যারা বসবাস করছেন, তারা মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছেন। হাসপাতাল, আবাসিক, বাণিজ্যিক, মিশ্র ও শিল্প এলাকা-নগরীর কোনো এলাকাকে নীরব এলাকা বলা যায়? শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালায় এই এলাকাগুলোর শব্দের সহনীয় মানমাত্রা দিনের বেলায় সর্বনিম্ন ৫০ থেকে সর্বোচ্চ ৭৫ ডেসিবেল নির্ধারণ করা হয়েছে। রাতের বেলায় তা আরও ৫ একক কম। বাস্তবে বিধিমালা মোটেই মানা হয় না। বাংলাদেশে শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে যে আইন ও বিধি রয়েছে, তা নিয়ে দু-এক বছর পরপর প্রচারণা চলে মাত্র। কিছু এনজিও এই নিয়ে কাজ করে। তবে কয়েক দিন চলার পর সব ঝিমিয়ে পড়ে।

শব্দ দূষণ এড়াবেন কিভাবে? যেখানেই থাকুন। যে অবস্থাতেই থাকুন। শব্দ আপনার কানের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। এজন্য বাস্তব কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। এক জোড়া ইয়ার প্লাগ কিনতে পারেন। পকেটে ইয়ার প্লাগ রাখুন। অবস্থা দেখে ব্যবস্থা নিন। মনে রাখবেন উচ্চ শব্দ এড়াতে ফোম সিলিকন, মোম, এসব কোনো কাজে লাগে না। আর হ্যাঁ। কানে কখনো তুলো দেবেন না। তুলো শব্দ প্রতিরোধ করে না। যদি প্লাগ ব্যবহার করেও বাড়তি শব্দ নিয়ন্ত্রণ না হয়, তাহলে আপনার কান দু'টো বিষেশজ্ঞ চিকিৎসককে দেখান, পরীক্ষা করান। এছাড়া যেখানে উচ্চগ্রাম শব্দ হচ্ছে সেখান থেকে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ান। স্টেডিয়ামে হৈ চৈ এর মধ্যে খেলা দেখলেন ভালো কথা। বাসায় এসে অমনি মিউজিক শুনবেন না। মাঝখানে বিরতি দিবেন। তা না হলে এসময় শিশুর ইলেকট্রিক গিটারের শব্দও মারাত্মক ক্ষতি করে। মনে রাখবেন, কান একবার বধির হলে কোনো মতেই ঠিকঠাক মতো আর ফিরে পাওয়া যায় না। বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন শ্রবণ যন্ত্র খুব একটি কাজ দেয় না। তাই প্রয়োজনে যখনই অডিও শুনবেন, ভলিউম এডজাস্ট করে শুনুন। কান মূল্যবান ইন্দ্রিয়। একবার বধির হলে আর রক্ষা নেই।

শেখ আনোয়ার : লেখক

এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আনার মতামত দিন।
মতামত দিতে চাইলে অনুগ্রহ করে করুন।
আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন।
সর্বাধিক পঠিত
ফটো গ্যালারি
আজকের পত্রিকা
আজকের নামাজের সময়সূচীআগষ্ট - ১৯
ফজর৪:১৬
যোহর১২:০৩
আসর৪:৩৭
মাগরিব৬:৩২
এশা৭:৪৮
সূর্যোদয় - ৫:৩৫সূর্যাস্ত - ০৬:২৭
পুরোন সংখ্যা
বছর : মাস :
আজকের পাঠকসংখ্যা
৭৮২৪.০
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতিঃ সৈয়দ এম. আলতাফ হোসাইন। সম্পাদক : আহ্সান উল্লাহ্। উপদেষ্টা সম্পাদক : মোঃ শাহাবুদ্দিন শিকদার। প্রকাশক ছৈয়দ আন্ওয়ার কর্তৃক রোমাক্স লিমিটেড, তেজগাঁও শিল্প এলাকা থেকে মুদ্রিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : খলিল ম্যানশন (৩য়, ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলা), ১৪৯/এ, ডিআইটি এক্সটেনশন এভিনিউ, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত। ফোন : ৯৩৫৭৭৩০ (বার্তা), ৮৩১৫৬৪৯ (বাণিজ্যিক), ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪.
ই-মেইলঃ djanata123@gmail.com, bishu.janata@gmail.com
ফোনঃ ০২৮৩১৫১১৫, ০২৮৩১৫৬৪৯ ফ্যাক্সঃ ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪
Copyright The Dainik Janata © 2010 Developed By : orangebd.com.