নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা, রোববার ১৩ আগস্ট ২০১৭, ২৯ শ্রাবণ ১৪২৪, ১৯ জিলকদ ১৪৩৮
শামুক
হাবিবুর রহমান তালুকদার
না, এভাবে আর চলতে পারে না, ভাবে রেহানা, ভাবে আরিফ, আর কতদিন চলতে পারে এভাবে, একসঙ্গে বসবাস করে এভাবে আড়ি নিয়ে থাকা যায়? এর একটা চূড়ান্ত হওয়া দরকার।

দরকার মনে করে রেহানাও। কিন্তু নিজের মর্যাদা বলে তো একটা জিনিস আছে। তাকে বিসর্জন দেয়া যায় না। তাই অস্থিরভাবে অপেক্ষা করতে যাকে নিজের মনের গোপন ইচ্ছাকে গোপন রেখেই চরম মুহূর্তের।

কিন্তু মাঝে মাঝেই তো এরকম হয়েছে আবার নিজেরাই তা ঝেড়ে ফেলে দিয়েছে। মনের কোণে যে মেঘ জমে উঠছিল, বৈশাখের দমকা হাওয়ায় কোথায় উড়ে গিয়েছে টের পাইনি কেউ। কিন্তু এবারে বুঝি তার চেয়েও একটু বেশি। তাই এর আয়োজনটাও যেমন প্রলম্বিত, বিস্ফোরণও বুঝিবা হবে তেমন বিকট আর ভয়াবহ। তবুও আশা করে বিস্ফোরণ হয়ে যাওয়াই ভালো_ তা যত ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক হোক।

আজ থেকে বারো বছর আগে, হ্যাঁ এক যুগই হয়ে গিয়েছে। ভাবে রেহেনা। অতীতের সব স্মৃতি মানসপটে ভেসে ওঠে রূপালী পর্দার সাজানো দৃশ্যপটের মতো। দুঃখ হয়, মায়া হয়, প্রথম জীবনে, যৌবনের উন্মেষকালে, প্রথম পুরুষ পরিচয়ে, মনের স্বপ্নীল আকাশে যে মোহময় ছায়া বিস্তার করেছিল, অমরাবর্তীর পুরুষ তার জন্য যে প্রেমের ডালি উপহার এনেছে তা বুঝি অফুরন্ত, তা মন্থনে হলাহল নয়, অমৃত লাভ করবে। কিন্তু তখন কি এতো বিচার বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা ছিল রেহানার। না, তা ছিল না। আর ছিল না বলেই নিতান্ত অবিবেচকের মতো একগুয়েমির ফলে আজ এ চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে সে। বাবা মার অবাধ্য হয়েই তার জীবন সমুদ্র পাড়ি দেয়ার জন্য এ কর্ণধারকেই বেছে নিয়েছে। মানসপটে যে ছবি কল্পনা করে আসছে, তাকে নিজের মনের মণিকোঠায় জিইয়ে রেখেছে, তার দেখা পেয়েছে রেহানা। কাজেই এ পরম পাওয়ার চরম সুযোগকে সে অবহেলা করবে এমন শক্তি তো তার নেই। হ্যাঁ, বাহ্যিক অবয়বে সুপুরুষ বলা চলে বটে। গৌর কান্তি, সুঠাম দেহের চেহেরা, উন্নত নাসিকা, কোঁকড়ানো চুল, রাশভারি, চলনে বলনে ইঙ্গিতময়, কাজেই কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। মা, বাবার আপত্তি ছিল। ভিন্ন জেলার লোক, পূর্বাপর জানাশোনা নেই। কিন্তু রেহানার যুক্তি ভিন্ন। তোমাদের সেকেলের মতবাদ রাখ, এখন আর ওসব কে দেখে। সকালের প্রথম সূর্যের আলো দেখেই বলা চলে দিন কেমন যাবে তবুও একবাক্যে সায় দিতে পারেনি বাবা মার মন। রক্তের প্রবাহ, তাকে তো উপেক্ষা করা চলে না, উত্তরাধিকার বংশ পরম্পরায় সে ধারা, গতি অব্যাহত থাকে। আধুনিক যুক্তি তাকে যতই উপেক্ষা করুক তবুও শেষ চেষ্টা করে দেখেছে। কিন্তু না, কলেজ পড়ুয়া রেহানার অন্ধ বিশ্বাসের কাছে তাদের সেকেলে যুক্তি ধোপে টেকেনি। কিন্তু মেয়ের এরকম ভাবধারা তো কোনোদিন দেখেননি তাই কিছুটা বিস্মিত ও হতবাক হয়েই শেষ পর্যন্ত মত দিয়েছিলেন মা, বাবা।

'না, না, তুমি আমায় ছুঁয়ো না,' হঠাৎ ভাবনায় ছেদ পড়ে রেহানার স্বামীর উপস্থিতিতে। নির্জন নিশুতি অন্ধকার রাতে মনের মুখোমুখি হয়ে বসেছিল রেহানা কিন্তু তা আর হলো না। কিসের এতো গর্ব, কিসের এতো অহঙ্কার। অজান্তেই আরিফের কণ্ঠ ফেটে পড়ে। ঝগড়া নয় বরং আপোসের মনোভাব নিয়েই অন্ধকারে চুপিচুপি স্ত্রীর কাছে এসেছিল। হ্যাঁ, তার ভালোবেসে বিয়ে করা স্ত্রী, এ রেহানাই ভালোবেসে মা বাবার অমতে তাকে বিয়ে করেছে। স্ত্রী থাকবে স্বামীর অনুগত, স্বামী অন্তঃপ্রাণ, স্বামীর সবকিছুকেই সহজ স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়ে দৈনন্দিন জীবন নির্বাহ করাই প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু আরিফ কিছুতেই বুঝতে পারে না কেন তাদের এই দ্বন্দ্ব, সংঘাত। কেন রেহানা তাকে সহজভাবে নিতে পারছে না। তার ভালো মন্দকে স্বাভাবিক বলে গ্রহণ করতে পারছে না। পুরুষ মানুষ প্রকৃতিতেই নারী থেকে আলাদা তাই যদি প্রবৃত্তিতে নিতান্ত ঘরকুনো না হয়ে কিছুটা বারমুখী হয় তাতে কি এমন আসে যায়। সে তো দেখে আসছে, আগের দিনে স্বামীর ইচ্ছায় স্ত্রীর ইচ্ছা, স্বামীর আনন্দ খুশিই স্ত্রীর আনন্দ খুশি। রেহানার মতো তার কলেজের শিক্ষা নাই বা থাকলো, কিন্তু তাই বলে কি জীবন সম্পর্কে সমাজ সম্পর্কে পারিপাশ্বর্িকতা সম্বন্ধে তার ধারণা কম? নিশ্চয়ই তা নয়। আরিফ কিছুতেই রেহানার এই ঔদ্ধত্যভাবকে প্রশ্রয় দিতে পারে না, পারে না সহজভাবে গ্রহণ করতে। 'আমার অহং-এর অহংকার, আমার ব্যক্তিত্বের গর্ব। তুমি কি বলতে চাও স্পষ্ট বলাই ভালো।' রেহানাও ঝাঁঝালো সুরে উত্তর দেয়। ভালোবেসে বাবা মার অমতে বিয়ে করে কি পেল রেহানা? স্বামীকে একান্ত আপনার করে পেতে চেয়েছিল কিন্তু তা কি হয়েছে? রাগ তো সংযত করে রাখতে পারেনি। যতই নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছে ততোই যেন শিথিল হয়েছে। অথচ দুঃসহ। স্বামীর আচরণ, ধ্যান-ধারণা কোনোদিন নিজের মনঃপুত হয়নি, চেষ্টা করেছে সমন্বয় সাধনের কিন্তু বারবার বিফলই হতে হয়নি শুধু, রূঢ় আচরণ মনকে আরো কঠিন করে তুলেছে।

'আমি যখন যা বলি তা স্পষ্ট করেই বলি। তুমি যদি বুঝতে না চাও তাহলে আমার আর বলার কি আছে। এভাবে থেকে না তুমি শান্তি পাচ্ছ, না আমি পাচ্ছি।'

'তোমার সুখ শান্তি, ধ্যান-ধারণা নিয়ে তুমিই থাকো। আমার সুখ শান্তির জন্য তোমার চিন্তা করতে হবে না।' রেহানার উত্তর। 'আজ হঠাৎ এমন করে আমার সুখ শান্তির কথা ভেবে উদগ্রীব হলে কেন? কোনোদিন তো তোমার এ ভাবালুতা ছিল না, তবে কি কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছ? আমাকে বকিয়োনা, দোহাই তোমার, একলা থাকতে দাও। আর তাছাড়া ছেলেমেয়েরা উঠে পড়তে পারে। ওরা বড় হয়েছে, কি ভাববে।'

এহেন পরিস্থিতিতে আরিফের মুখ দিয়ে আর কোনো বাক্য নিঃসরিত হয় না, স্ত্রীর এহেন আচরণে আরিফ সব সময় ভ্যাবাচ্যাকা খায়, অগত্য কিছু সময় উপবেশন করে গাত্রোত্থান করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।

পাশ ফিরে শুলো রেহানা, জানালা দিয়ে দৃষ্টিকে যতদূর সম্ভব প্রসারিত করে দেয়। অন্ধকার ভেদ করে দূরে ছোট্ট একটি আলোর রেখা দৃষ্টিগোচর হয়। বাইরের রাস্তায় কোনো আলো নেই, জনমানবহীন। কুকুরগুলো, পাখিসব এমন কি পোকারা পর্যন্ত নীরব। তারাও বোধ হয় শ্রান্তি বিনোদনের চেষ্টা করছে। শুধু রেহানাই পারছে না দু'চোখের পাতা এক করতে। দুনিয়ার সমস্ত চিন্তা সমস্ত ভাবনা যেন তাকেই পেয়ে বসেছে। বাইরের নির্জন অন্ধকারের মতোই মনে হয় তার জীবন। কেউ বুঝতে চেষ্টা করলো না, কেউ আলো জ্বালালো না আর পেল না মানিক রতন। অথচ, অথচ কিনা আছে এখানে। তার মন যে ঐশ্বর্যে সমৃদ্ধ, যে ভা-ারে তা রক্ষিত, তা তো কোনোদিন উন্মেচিত করে দেখলো না স্বামী। তবে কার জন্য ঐ লৈবেদ্যের ডালি। হ্যাঁ, যদি কেই সন্ধান করে পায় তবে তাকে নিবেদন করতে পারে এ সম্ভার। ভাবে রেহানা, তার কাছে ন্যায় আর অন্যায়ের কোনো সীমরেখা নেই। জীবনকে যদি অর্থবহ, মধুময়, মনকে যদি প্রশান্তিতে ভরিয়ে তুলতে না পারল তবে কি হবে ন্যায় আর অন্যায়ের সীমা সরহদ্দ টেনে। ঐ দূরের টিমটিম করা বাতিটার মতোই বুঝি তার জীবন। দূর কোনো অজানা দ্বীপে তার জীবনের স্বার্থকতার ইঙ্গিত আছে জানে না, তাই খুঁজতে বেড়িয়েছিল, হয়তো একটু আশার আলো দেখতে পেয়েছে কিন্তু তার ভিত এমন শক্ত নয় যে তাকে আশ্রয় করে দাঁড়াতে পারে।

ঘুম নেই আরিফের চোখেও। কেন এমন হয় কিছুটা ভাববার চেষ্টা করে সেও, যদিও তার ধাতে এ সমস্ত ভাবনা চিন্তা আসে না, তার মতে এ সমস্ত ভাবনার কি আছে? যার যা কর্তব্য তা সঠিকভাবে পালন করাই তো জীবন। পৃথিবী যেমন প্রতিনিয়ত নিজস্ব গ-িতে আবদ্ধ থেকে সূর্যকে পরিক্রম করে আসছে। মানুষের জীবনও তো তেমনি। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে সংসার চক্রে আবর্তিত হওয়াই তো ধর্ম। হাত, পা, কাটলে ব্যথা অনুভূত হয় কিন্তু না কাটলে তা মনে করে অহেতুক সে ব্যথা অনুভব করার মতো বোকামি আর কি থাকতে পারে? এ সমস্ত ভাবাবেগ কোনোদিনই আরিফের কাছে প্রশয় পায়নি। তাই সে বস্তুজগৎ তথা সংসারধর্ম, সর্বোপরি অর্থনৈতিক আকর্ষণকেই প্রাধান্য দিয়ে আসছে। তাই সে বিয়ের পরে স্ত্রীকে বলেছিল 'কি হবে আর লেখাপড়া করে। তোমার ঐ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার ফলে কি মোক্ষলাভ হবে' কিন্তু রেহানার ভারি ইচ্ছে ছিল পড়াশুনা চালিয়ে যাবার। 'মানুষ লেখাপড়া করে কেন? এর কি কোনো মূল্য নেই, জ্ঞান আহরণের কি মানুষের জীবনে প্রয়োজন নেই?'

'আরে রাখো তোমার জ্ঞান, জ্ঞান কোথায়? ঐ সমস্ত পুঁথির মধ্যে না শিক্ষকদের পেটে? আসলে তো কিছুই নয়। কতকগুলো বাতিকগ্রস্ত লোক নিজেকে বাতিকের জন্য অবোল-তাবোল লিখে রেখেছে আর তা পড়ে, তা থেকে শিখিয়ে কোনো জ্ঞান দান করে? পরন্ত ঐগুলো পড়ে, শিখিয়ে ভালো লোকগুলোকেও বাতিকগ্রস্ত করে তুলছে।'

রেহানার কোনো যুক্তিই স্বামীর কাছে সেদিন টেকেনি, অগত্যা বাধ্য হয়ে পড়াশুনা বন্ধ করে গৃহকর্মে মন বসাতে হয়। না, আরিফও যেন কিছু ভাবতে পারে অন্তত; এ মুহূর্তে। হ্যাঁ, এও এক রকম বাতিক। ঘুম আসছে না বলে সে বাতিকগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। তরল পদার্থের যেমন নিজস্ব কোনো আকার নেই, তাকে রাখতে হলে আধারের প্রয়োজন। তেমনি স্ত্রীলোক সংসার রূপ আধারে স্বামীকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত গৃহকর্মের মধ্যে। নিজস্ব পরিসরে আবর্তিত হবে। সে জানে স্ত্রী লোকদের বেশি প্রশ্রয় দেয়া ঠিক নয় আর গ-ির বাইরেও যেতে দিতে নেই কারণ সে নিজেই দেখেছে সে বলয়কে অতিক্রম করে যারা বাইরে এসেছে, নিজস্ব পরিবেশকে প্রসারিত করেছে, তারা বহির্জগতের আবহাওয়ায় শুধু পরিপুষ্টিতাই লাভ করেনি, তার তীব্র দহনে? নিজের অদৃষ্টও কিছু না কিছু পুড়িয়েছে।

ভাবে রেহানা, তার ভাবনার যেন আর শেষ নেই। জীবনটা শুধু অন্ধকারময়। সম্মুখে, পশ্চাতে, যতদূর দৃষ্টি যায় শুধু নিকষ কালো, হাতড়ে কোথাও আশার ক্ষীণ আলোও দৃশ্যমান নয়। তবুও নিরাশ হয় না তবে মাঝে মাঝে স্বামীর রূঢ় আচরণ মনকে খুব পীড়া দেয়, মনের সুকুমার বৃত্তিকে কুঁকড়ে কুঁকড়ে নষ্ট করে ফেলে। শিক্ষা জীবনের শুরু হয়েছিল একটি আশ্রমে। সেখানের আচরণ, শিক্ষা, সংস্কৃতি পরবর্তী জীবনেও কিছুটা ছাপ রেখেছিল রেহানার মনে। তাই সে কিছুটা সঙ্গীত ও নৃত্য শিল্পেরও চর্চা করেছিল এককালে। কিশোর বয়সে কিছু কিছু কবিতাও লিখেছিল কিন্তু সব কিছুই তো অঙ্কুরে বিনষ্ট হয়েছে। স্বামী যদি এ সবের সমঝদার হতো, তাকে বুঝতে চেষ্টা করত তবে কোনো দুঃখ থাকত না। হয়ত মনকে অন্তত প্রবোধ দেয়া যেত আর পরিণত বয়সে, পরিণত মন নিয়ে সাহিত্য এবং সংস্কৃতির চর্চাও করতে পারত। কিন্তু পারত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লেখাপড়াই বন্ধ হয়ে গেল। তার মনের এ মৃত্যর চেয়ে গলা টিপে হত্যা করে ফেলাই ভালো ছিল। প্রথম প্রথম চেষ্টা করেছিল স্বামীকে এ সমস্ত বুঝবার, মনের মধ্যে যে মন লুকিয়ে আছে তার পাপড়িকে মেলে ধরবার কোনো মূল্য, কোনো আকর্ষণ বোধ করেনি স্বামীর কাছ থেকে। নিতান্ত সাংসরিক অন্য দশটা উপকরণের মতোই তাকেও একটা সত্যাবশ্যকীয় উপকরণ মনে করেছে, এর বেশি কিছু নয়। তার কাছে কোনোদিন কোনো ভাবাবেগ স্থান পায়নি। স্বামীকে সে শুধুমাত্র একজন অভিভাবকই মনে করতে পারে এর বেশি আর কি পেয়েছে? নিতান্ত জৈবিক প্রয়োজনেই সে সন্তানের মা হতে পেরেছে কিন্তু তার সঠিক তো আর কিছু নয়। এভাবেই তো দিনের পরে মাস, মাসের পর বছর গড়িয়ে চলছে এ ক্ষুদ্র সংসারের চার দেয়ালের গ-ির মধ্যে। হ্যাঁ, বলা চলে তারপরে সুযোগই এসে গেল রেহানার জন্য। মেয়েরা তো আজকাল বেশ চাকরি করছে_ বিভিন্ন অফিস আদালতে। তবে সেও কেন চেষ্টা করে না, স্বামীর মতো হবে না, তা নাই বা হলো, চেষ্টা করতে দোষ কি? দু-এক জায়গা থেকে সাক্ষাৎকারের আমন্ত্রণও পেয়েছে। অনেক বুঝিয়ে স্বামীর সায় পেল। অন্তত বর্তমান আর্থিক দুর্দিনে আমি শুধু ঘরে বসে না থেকে যদি তোমাকে কিছু সাহায্য করতে পারি তবে ক্ষতি কি? ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছে ওদের জন্য তেমন চিন্তা নেই।' শেষ পর্যন্ত রাজিই হলো আরিফ। সরকারি অফিসের চাকরি, কিছুটা চেনা-জানা। সকালে অফিসে হাজিরা দেয়া, তেমন কোনো কাজ নেই আর দুপুরে বাসায় ফেরা, মোটামুটি ভালো লাগে রেহানার। আস্তে আস্তে পরিচয় হয় সহর্কমীদের সাথে। নিজের সেকশন ছাড়াও অন্য সেকশনের কেউ আলাপ করতে চাইলে তাতে কার্পণ্য করে না রেহানা। অনেকদিন পরে মুক্ত মন নিয়ে খোলাখুলি কথা বলার সুযোগ পায় সে। খুব ভালো লাগে। জীবনে একটা নতুন অনুভূতি, হয়তো সব হারিয়ে কিছু পাওয়া। আস্তে আস্তে দু-একজনের সঙ্গে অন্তরঙ্গতো হয় রেহানার তার মধ্যে সুয়েলকেই মনে পড়ে বেশি। স্বামী অফিসে পৌঁছে দেয় আবার ফেরার পথে নিয়ে যায় তবুও দিনের মধ্যে যে কয় ঘণ্টা সময় সে পায় নিজস্বভাবে তার জন্য একটা মমতা অনুভব করে, দুর্বার আকর্ষণ জাগে। প্রথম পরিচয়েই সুয়েলকে ভালো লেগেছে। নিরীহ শান্ত স্বভাবের, সৌম্য কান্তি, ছিপছিপে লম্বা গগনের, কথা বলার একটা নিজস্ব ভঙ্গি আছে, পরে জেনেছে লেখাপড়াও বেশ করেছে। যদিও অন্য সেকশনে তবুও একরকম রোজই আলাপ হয় তার সঙ্গে। কখনও সে আসত কখনও বা রেহানা যেত।

শেষ পর্যন্ত তো অফিসময় কথাটা বেশ মুখরোচক হয়ে উঠল কিন্তু তাতে কিছু আসে যায় না রেহানার। মাঝে মধ্যে অফিস ফাঁকি দিয়ে সুয়েলের সঙ্গে বেড়িয়েও এসেছে রেহানা কিন্তু কোনোদিন সুয়েলকে অভদ্র বা স্বার্থপর মনে হয়নি। যতই তার সঙ্গে মিশেছে, আলাপ করেছে, ততই তার মুক্ত মনের বিশাল পরিধি দেখে অবাক হয়েছে। সুয়েলের সঙ্গ খুব ভালো লাগত, ভালো লাগত তার সানি্নধ্য, আর রসিয়ে রসিয়ে আলাপ করতে। জীবনের নতুন করে যেন একটা অর্থ খুঁজে পেয়েছে রেহানা। না, অন্তত তার ধৈর্য আর প্রতীক্ষা বিফল হয়নি। সুয়েলের ওপর নির্ভর করা চলে, মনের পরিপূর্ণতা এনে দিতে পারে_ রেহানার বিশ্বাস তবুও মনের অগোচরে একটা কাঁটা খচ খচ করে বিঁধে। সুয়েল অবশ্য কোনোভাবাবেগ বশে কোনো আশ্বাস দেয়নি, অনেক ভেবে চিন্তে বলেছে, যতদিন আমরা পরস্পরকে নিবিড় করে না পাই ততদিন সম্ভত; বন্ধুভাবে থাকতে পারি। অবশ্য আমাদের এ পাওয়া নির্ভর করছে আমাদের নিয়তির উপর, এরমাত্র ভবিষ্যতই বলতে পারে এর শেষ কোথায়?

ভাবে রেহানা তাতেই বা কি লাভ? অনাগত ভবিষ্যতে কোনো অমৃত লাভ করবে কিংবা লাভ হবে কিনা সে আশায় তো আর জীবনভর অপেক্ষা করা চলে না। সুয়েল বিবাহিত, তার স্ত্রীকে রেহানা দেখেছে, আলাপ করেছে কিন্তু এমন কোনো আশার আলো পায় যা যা শক্ত করে আঁকড়ে থাকা যায়। না, ওসব হবে না। নগদ যা পাওয়া যায় তাতেই মন ভরিয়ে তুলতে হবে, ভবিষ্যতের আশায় দিন গোনা যায় না তাই সুয়েলের সংশ্রবও সহজেই কাটিয়ে উঠেছে রেহানা। রেহানা জানে পুরুষকে বেশি প্রশ্রয় দিতে নেই। অবশ্য সুয়েলের কথা যদিও ভিন্ন তবুও কি দরকার।

এই তো সেদিন সহকর্মী জহির কাজের ফাঁকে চানাচুর মুখে পুরে দিল খুব ভালো লাগল রেহানার। এই যে একটু রোমাঞ্চ, পুলক তার বর্তমান মূল্যটাই বেশি। কিন্তু এদিক-ওদিক চেয়ে কেমন যেন একটা সঙ্কচ জাগল তার ছি! অন্যরা কি ভাববে? সে তো বিবাহিতা, সন্তানের জননী। এতদিন কম অভিজ্ঞতা হয়নি রেহানার_ পুরুষ সম্বন্ধে, বাইরের জগত সম্বন্ধে। সকলেই যেন লোলুপ লালসাতুর দৃষ্টিতে তাকে অবলেহন করে। পুরুষ মাত্রই স্বার্থপর, তারা অবিবেচক, আন্তরিকতার কোনো দাম নেই তাদের কাছে। মাঝে মাঝে ভারি বিশ্রি লাগে রেহানার। অন্তত এ মুহূর্তে সকলের প্রতি একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়, মনে হয় স্বামীকে ক্ষমা করতে পারে। সে তো সন্তানের মা, গৃহিণী, শুধু এ পরিচয়ে তো বেঁচে থাকা চলে। স্বামীর আদর সোহাগ আর দশজনের মতো নাইবা পেল কিন্তু তাই বলে স্বামী তাকে ভালোবাসে না এ কথা তো বলা চলে না।

চোখ দুটো জ্বালা করে, মাথা ঝিমঝিম করে রেহানার। অন্তরটা যেন শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। উঠে জল গড়িয়ে খেল। উঁকি দিয়ে দেখল ছেলেমেয়েরা ঠিকভাবে ঘুমাচ্ছে কিনা, রাত কত হবে? না ঘড়ি দেখতে ইচ্ছে করে না। বাকি জীবনটা যদি এভাবে অন্ধকারে থেকে ভেবে ভেবে কাটিয়ে দিতে পারত তবে বোধ হয় ভালো হতো। মনের অজান্তে পা দুটো স্বামীর ঘরের দিকে এগুলেও আবার ফিরে আসে নিজের ঘরে। সেখানে স্বামীকে দেখে কিছুটা অবাক হয়েই বলল_'তুমি আবার এখানে, ঘুমাওনি এখনও?

'ঘুম তো আসছে না, তাই তোমার কাছে এলাম' সাক্ষাত উত্তর আরিফের। রেহানার জন্য মনটা কিছু সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে।

'ঘুম কি আমি দিতে পারি, তোমার বিশ্বাস হয়?'

'তুমি সবই দিতে পার।'

রেহানা বলে, সব যদি আমি দিতেই পারি, তুমি কি সব নিতে পারবে? একদিন তো আমি আমার সবই দিয়েছিলাম কিন্তু তুমি নিতে পারলে কই? সেদিন তো আমার দিকে ফিরেও তাকাওনি। শুধুমাত্র একটা সাংসারিক উপকরণ ব্যতীত কিছু ভাবনি তো।

কোথা থেকে কোথায় গড়িয়ে যাচ্ছে। আরিফের এ সমস্ত হেয়ালিপূর্ণ কথা ভালো লাগে না, তাই চুপ করে থাকে।

রেহানা আবার বলে, 'তোমার তো বুঝবার সাধ্য নেই মেয়ে মানুষের মন বলে আলাদা একটা জিনিস আছে। তোমাদের সঙ্গে তার অনেক তফাত। মেয়ে মানুষ স্বামী, শ্বশুর বাড়ি, টাকা, গাড়ি সব পেলেও কিছুই পাওয়া হয় না। কেন তুমি আমাকে বুঝতে চেষ্টা কর না, কিসে আমার ব্যথা, দুঃখ-কষ্ট, আনন্দ। আর সব স্বামী যেমন করে স্ত্রীর সঙ্গে ব্যবহার করে তেমন তুমি করতে পার না?'

রেহানা আজ যত খুশি অভিযোগ করুক, আরিফ কিছু বলবে না। হয়ত রেহানার কথাই ঠিক, সে অন্য দশজন স্বামীর মতো নয়। নিজের মনের ফাঁক নিয়ে তো অন্যের ফাঁক পূর্ণ করা চলে না। আরিফ রেহানার পাশ ঘেঁষে বসে নিজের দিকে একটু আকর্ষণ করে। রেহানা কোনো আপত্তি করে না।

'এবার থেকে আমি বুঝতে চেষ্টা করব, তুমি আমাকে একটু সাহায্য কর কেমন?'

রেহানাও যেন খুব পরিশ্রান্ত, অনেক পথ পরিভ্রমণ করেছে, এখন এটকু বিশ্রাম চায়। চায় একটু নিরাপদ আশ্রয়। আর স্বামীর বুকেই আছে সে নিরাপদ আশ্রয়_ এ ধারণা রেহানার হয়েছে। স্বামীর বুকে মাথা রেখে রেহানাও বলে, 'এখন থেকে তাই হবে।'

এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আনার মতামত দিন।
মতামত দিতে চাইলে অনুগ্রহ করে করুন।
আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন।
সর্বাধিক পঠিত
ফটো গ্যালারি
আজকের পত্রিকা
আজকের নামাজের সময়সূচীআগষ্ট - ২২
ফজর৪:১৮
যোহর১২:০২
আসর৪:৩৫
মাগরিব৬:৩০
এশা৭:৪৫
সূর্যোদয় - ৫:৩৬সূর্যাস্ত - ০৬:২৫
পুরোন সংখ্যা
বছর : মাস :
আজকের পাঠকসংখ্যা
২০৭৩.০
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতিঃ সৈয়দ এম. আলতাফ হোসাইন। সম্পাদক : আহ্সান উল্লাহ্। উপদেষ্টা সম্পাদক : মোঃ শাহাবুদ্দিন শিকদার। প্রকাশক ছৈয়দ আন্ওয়ার কর্তৃক রোমাক্স লিমিটেড, তেজগাঁও শিল্প এলাকা থেকে মুদ্রিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : খলিল ম্যানশন (৩য়, ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলা), ১৪৯/এ, ডিআইটি এক্সটেনশন এভিনিউ, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত। ফোন : ৯৩৫৭৭৩০ (বার্তা), ৮৩১৫৬৪৯ (বাণিজ্যিক), ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪.
ই-মেইলঃ djanata@dhaka.net
ফোনঃ ০২৮৩১৫১১৫, ০২৮৩১৫৬৪৯ ফ্যাক্সঃ ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪
Copyright The Dainik Janata © 2010 Developed By : orangebd.com.