নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা, বুধবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৩১ ভাদ্র ১৪২৮, ৬ সফর ১৪৪৩
বিপ্লবী বীর ক্ষুদিরামের ফাঁসির গান নিয়ে মতানৈক্য ও বিভ্রান্তি
মো. জোবায়ের আলী জুয়েল
আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে শহীদ ক্ষুদিরামের আত্মদানের কাহিনী আজ প্রবাদে পরিণত হয়েছে। ক্ষুদিরাম আমাদের কাছে দেশপ্রেমের এক চিরন্তন আদর্শ, এক অন্তহীন অনুপ্রেরণা। ফাঁসির মঞ্চে জীবনের যে জয়গান গেয়ে গেছেন এই চির-নির্ভিক, চির-কিশোর, দেশপ্রীতির সে এক বিরল দৃষ্টান্ত। আবেগে অশ্রুতে ভরা সে বেদনাময় ইতিহাস আজও আমাদের হৃদয় মথিত করে তোলে।

দূর অতীতে পল্লী বাংলার এক লোককবি বাঙালি পীতাম্বর দাস বাউল মনের গভীরে বেদনা মিশিয়ে সেদিন ক্ষুদিরামের ফাঁসির গান (কথা ও সুরঃ পীরাম্বর দাস বাউল) বেঁধেছিলেন। সে গান ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলাদেশের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত। আমাদের মনে প্রাণে আজও লেগে আছে সে গাণের মর্মস্পর্শী রেশ।

একবার বিদায় দে, মা ঘুরে আসি।

আমি হাসি হাসি পরবো ফাঁসি/দেখবে ভারতবাসী কলের বোমা তৈরি করে/দাঁড়িয়ে ছিলাম রাস্তার ধারে মাগো,বড় লাটকে মারতে গিয়ে, মাগো/মারলাম ভারতবাসী/হাতে যদি থাকতো ছোরা, তোর ক্ষুদি কি পড়তো ধরা? রক্তগঙ্গা বয়ে যেতো মা'/দেখতো' জগৎ বাসী থাকতো যদি টাট্টু ঘোড়া,তোর ক্ষুদি কি পড়তো ধরা, ও মা, এক চাবুকে চলে যেতাম/গয়া, গঙ্গা, কাশী শনিবার বেলা দশটার পরে/জর্জ কোর্টেতে লোক না ধরে, মাগো/হলো অভিরামের দীপান্তর মা/ক্ষুদিরামের ফাঁসি বাঈশ লক্ষ তেত্রিশ কোটি/রইলো মা' তোর বেটা-বেটি, মা গো, তাদের নিয়ে ঘর করিস মা, বউদের করিস দাসী কাঁচের বাসন, কাঁচের চুড়ি/পরো না মা, বিলীতি শাড়ি/ওমা, মনের দুঃখ মনেই রইলো/হলো না আমার স্বদেশী দশ মাস দশ দিন পরে/জন্ম নেবো মাসির ঘরে মাগো,তখন চিনতে যদি না পারিস মা/দেখবি গলায় ফাঁসি। (কথা ও সুরঃ পীতাম্বর দাস বাউল)

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননের মাঠে ইংরেজ ব্যবসায়ীরা যে প্রায় বিনা যুদ্ধেই জয়লাভ করেছিল এবং ভারতে নিজেদের সামাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করতে পেরেছিল সেটাও ঘটেছিল একটি ঐতিহাসিক বিশ্বাস ঘাতকতার কারণেই।

পরবর্তীতে ক্ষুদিরামকে নিয়ে অতুলনীয় জনপ্রিয় এই দেশাত্মবোধক গান তৈরি হয়েছিল। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে সে গানটি লিখেছিলেন ও সুর দিয়েছিলেন পীতাম্বর দাস বাউল। মুখে মুখে যে ভাবে গানটি গাওয়া হয়েছে এবং মানুষকে দেশপ্রেমে যেভাবে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে তা' অসাধারণ বৈকি। ওই গানটির শুরু টা আমরা প্রায় সবাই জানি, 'একবার বিদায় দে' মা ঘুরে আসি, আমি হাসি হাসি পরবো ফাঁসি দেখবে ভারতবাসী'। গানটির মধ্যে বিস্তর ভুল জিনিস সনি্নবেশ করা হয়েছে (যা' এই প্রবন্ধে আমি উপস্থাপন করতে চেষ্টা করছি)। সবচেয়ে আর্শ্চয্যজনক ব্যাপার হলো গানের ভেতরে দু'টি অবিশ্বাস্য পঙক্তি কীভাবে অনুপ্রবেশ করলো সেটা ভাবলে চিন্তিত হতে হয়। সে দুটি হলো- 'বাইশ লক্ষ তেত্রিশ কোটি রইলো মা তোর বেটা বেটি, তাদের নিয়ে ঘর করিস মা' বউদের করিস দাসী' গানে বউদের কে দাসী করবার কথা কেনো বলা হচ্ছে। বউদের জায়গায় কেউ বসিয়েছেন ওদের, কেউ তাদের, কিন্তু দাসী শব্দটি বদলানো সম্ভব হয়নি। বউদের স্থানে ওদের বা তাদের বসালে মেয়েরা যে সম্ভাব্য দাসী হওয়া থেকে মুক্তি পাবে এমন ব্যবস্থা ও গানটির ভেতরে নেই। বিপ্লবী এই বিখ্যাত গণ সঙ্গীতে মেয়েদের কে 'দাসী' করবার কথা বলা হচ্ছে কেনো এটি আমাদের বোধগম্য নয়। পীতাম্বর দাস (কথা ও সুর) কেনো তার নিজের দৃষ্টি ভঙ্গিকে এভাবে গানে অনুপ্রবিষ্ট করে দিয়েছেন তাও বোঝা গেলোনা। এসব নানা প্রশ্ন গানটির মধ্যে থেকে যায়, তবুও পরবর্তীতে পঙক্তি দুটি যে প্রত্যাখাত হয়নি তা' আমরা গানটির মধ্যে দেখতে পাই।

গানটিতে অভিরামের দীপান্তরের কথা বলা হয়েছে। এই অভিরাম কে ছিলেন? তাঁর পরিচয় গানটির মধ্যে নেই। কেউ কেউ এই অভিরাম কে ক্ষুদিরামের সহদোর ভাই বলেছেন এটিও ঠিক নয়, যতদূর আমরা জানি বিপ্লবী উল্লাস কর দত্তকে কেউ কেউ ছদ্মনামে অভিরাম বলে ডাকতেন। এই উল্লাস কর দত্ত বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের শক্তিশালী বোমার আবিষ্কারক। ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল মোজাফ্ফর ম্যাজিষ্ট্রেট কিংস ফোর্ডকে হত্যা করতে চালানো হয় বোমা হামলা। এর অন্যতম নায়ক ছিলেন ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্লচাকী। বর্তমান ব্রাহ্মনবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলার কালী কচ্ছ গ্রামে ১৮৮৫ সালের ১৬ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন বিপ্লবী উল্লাস কর দত্ত। পিতা দ্বিজ দাস দত্ত ছিলেন জাতীয়বাদ অনুসারী। ১৯৬৫ সালের ১৭ মে উল্লাস কর দত্ত (ছদ্মনাম অভিরাম) মারা যান।

১৯০৮ সালে ৩৬ জন বিপ্লবীকে কলকাতা থেকে গ্রেফতার করা হয়। এদের বিরুদ্ধে 'আলিপুর বোমা ষড়যন্ত্র মামলা' দায়ের করা হয়। উল্লাসকর দত্তকে স্বাধীন ভারত সরকার স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদানের জন্য ভাতা মঞ্জুর করলে তিনি তা গ্রহণে অস্বীকার করেন। সবিনয়ে ফিরিয়ে দেন সে ভাতা। বারীন্দ্র কুমার ঘোষ এবং উল্লাসকর দত্ত (ছদ্ম নাম অভিরাম) কে যাবজ্জীবন দীপান্তর দেয়া হয় ব্রিটিশ আমলে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে ক্ষুদিরাম পিতা-মাতার একমাত্র কনিষ্ঠ পুত্র সন্তান ছিলেন। তাঁর কোনো সহোদর ভাই ছিল না। তাঁর তিন সহোদর বোন ছিল। তাঁরা হলেন- অপরূপা দেবী, ননী বালা ও সরোজিনী।

এবার আমরা ক্ষুদিরাম প্রসঙ্গে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করব-

ক্ষুদিরামই বাংলার প্রথম বিপ্লবী যাঁর বিরুদ্ধে ইংরেজ সরকার সর্বপ্রথম রাজদ্রোহের মামলা দায়ের করেন। জেল-হাজতে পুরে দেয়া হয় বালক ক্ষুদিরামকে। অবশ্য অল্পবয়সের বালক বলে তৎকালীন বিচারক আসামী ক্ষুদিরামকে মুক্তি দিয়েছিলেন।

ক্ষুদিরাম (১৮৮৯-১৯০৮ খ্রি.) সম্পর্কে আরো একটি প্রচলিত বিশ্বাস এই যে, ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের তিনি ছিলেন প্রথম শহীদ। তার বিপ্লবী সাথী প্রফুল্ল চাকীও মজঃফরপুরে গিয়েছিলেন তার সঙ্গী হয়ে। সে আরেক ইতিহাস। তার সম্পর্কে অন্য প্রবন্ধে বিস্তারিত লেখার ইচ্ছা রইলো। তবে এতটুকু না বললেই নয় এই প্রফুল্ল চাকীর বাড়ি ছিল বগুড়া জেলার বিহার গ্রামে। স্বর্ণময়ী দেবী ছিলেন তাঁর মা ও পিতা রাজ নারায়ণ চাকী। কিন্তু তার শৈশব কেটেছে আমাদের রংপুর শহরের গুপ্তপাড়ায়। তিনি ছিলেন রংপুর জেলা স্কুলের ছাত্র। প্রথমেই ক্ষুদিরামের এই গানে বলা হয়েছে-কলের বোমা তৈরি করে/দাঁড়িয়ে ছিলাম রাস্তার ধারে মাগো, বড় লাটকে মারতে গিয়ে মা'/মারলাম ভারত বাসী ক্ষুদিরাম কোনো ক্রমেই বড় লাটকে সে সময় বোমা মারতে যায় নাই। ১৯০৮ সালে এপ্রিলের শেষ দিনে প্রফুল্ল চাকী ও ক্ষুদিরাম দুজন বাঙালি যুবক ভূতপূর্ব কলকাতার চীফ প্রেসিডেন্সী ম্যাজিষ্ট্রেট মিষ্টার কিংস ফোর্ড (পরবর্তীতে কিংস ফোর্ড মজফফরঃপুরে বদলী হন) কে তাঁর বাংলোর সামনে মজফফরঃপুরে রাত ৮ টার দিকে একটা ঘোড়ার গাড়ি লক্ষ্য করে বোমা নিক্ষেপ করে। বোমার আঘাতে গাড়িটি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে অগি্ন দগ্ধ হয়। দুর্ভাগ্যবশতঃ ওই গাড়িটিতে কিংস ফোর্ড ছিলেন না। গাড়ি খানা ছিলো খ্যাতনামা ইংরেজ ব্যারিষ্টার মিষ্টার কেনেডির। গাড়ির ভেতরে উপবিষ্ট কেনেডির স্ত্রী ও কন্যা বোমার আঘাতে প্রাণ হারান।

বাংলার বিপ্লবীরা এর আগে পূর্ব বঙ্গ ও আসামের লেঃ গর্ভনর স্যার ব্যামফিল্ড ফুলার এবং পশ্চিম বঙ্গের লেঃ গর্ভনর স্যার ফ্রেজারকে বোমার আঘাতে হত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। তাদের বোমা ও পুতে রাখা মাইনের আঘাতে নারায়ণ গড় ষ্টেশনের ট্রেনের ক'খানা বগি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিলো। তাই অবলীলাক্রমে বলা চলে ক্ষুদিরামের বড় লাটকে বোমা মারার কথাটি অদৌ ঠিক নয়। এটি ভুল তথ্য। তখন ভারত বর্ষে লর্ড মিন্টো (দ্বিতীয়) ছিলেন বড়লাট (ভাইসরয়)। ১৯০৫ সাল থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত ছিল তাঁর সময়কাল। দ্বিতীয়তঃ ক্ষুদিরাম সম্পর্কে লোকগাঁথায় এই গানে আরোও বলা হয়েছে-'হাতে যদি থাকতো ছোরা, তোর ক্ষুদি কি পড়তো ধরা'?

এটি শুনে মনে হয় ক্ষুদিরাম বুঝি নিরস্ত্র অবস্থায় পুলিশের নিকট ধরা পড়েছিলো। কিন্তু বাস্তবে ঘটনাটি ছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। ধরা পড়ার সময় ক্ষুদিরামের নিকট অবশ্যই দু'টি রিভলবার ও গুলিও ছিলো। পুলিশের কাছে ক্ষুদিরাম কখনোই নিরস্ত্র অবস্থায় ধরা পড়েনি। তৃতীয়তঃ ক্ষুদিরামের নামের বানানটিও বিতর্কিত। কারণ ক্ষুদ্র শস্যকণা থেকে ক্ষুদ্রজাত 'খুদ' শব্দটির বানান 'ক্ষুদ' দিয়ে করাটা আধুনিক রীতি নয়। সেদিক থেকে 'খুদিরাম' বানানটিই সংগত। চতুর্থত: অনেকেই বিশ্বাস করেন বালক ক্ষুদিরাম ধরা পড়ার পর পুলিশী নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। সুতরাং এসব তথ্য ও প্রমাণাদি থেকে বলা যায়, ক্ষুদিরামের একটা নির্ভুল জীবনী রচনা করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য এবং কঠিন ব্যাপার।

১৮৮৯ সালে ৩ ডিসেম্বর, মঙ্গলবার মেদিনীপুর শহর সংলগ্ন কেশবপুর থানার অন্তর্গত মোহবণী গ্রামে ক্ষুদিরাম জন্মগ্রহণ করেন। এই শিশুর জন্মস্থান নিয়ে বির্তক আছে বরাবরই। কেউ বলেছেন তাঁর জন্ম হয়েছিল হবিবপুরে, অন্যেরা দাবি করেন মহোবনী গ্রামে। ১৮৭৫ খ্রিষ্টাব্দে ক্ষুদিরামের পিতা ক্ষুদিরামের জন্মের আগেই হবিবপুরেই চলে আসেন। কাজেই এটি ক্ষুদিরামের জন্মস্থান। তাঁর পিতার নাম ছিল ত্রৈলক্যনাথ বসু ও মাতার নাম লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী। ক্ষুদিরাম ছিলেন পিতা-মাতার সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। ক্ষুদিরামের পিতা মেদিনীপুর শহরে 'নাড়াজোল রাজ এষ্টেটের' শহর তহশীলদার হিসাবে চাকরি করতেন। জনশ্রুতি রয়েছে লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবীর সন্তান অকালে মারা যায় বলে একটা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষুদিরামকে তারই বড় বোন অপরূপা দেবী তিনমুঠো খুদের বিনিময়ে কিনে নিয়েছিলেন বলেই তার নাম হয় ক্ষুদিরাম। মাত্র পাঁচবছর বয়সেই ক্ষুদিরাম তার পিতা-মাতাকে হারিয়ে পিতৃ-মাতৃহীন হয়ে পড়ে। ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে ক্ষুদিরামকে 'তমলুক হ্যামিল্টন' স্কুলে চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি করে দেয়া হয়। এরপর ক্ষুদিরাম মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলে লেখাপড়া শুরু করেন। এই কলেজিয়েট স্কুলে অধ্যয়ন কালে ছাত্রাবস্থাতেই ক্ষুদিরামের মানসিক পরিবর্তন আসতে থাকে এবং তিনি তখন থেকেই রাজনীতির প্রতি প্রবল আকর্ষণবোধ করতে থাকেন।

ক্ষুদিরাম সেকালের নামকরা রাজনীতিবীদ হেমচন্দ্র কানুনগো, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, বিপিন চন্দ্র পাল, শ্যামসুন্দর চক্রবর্তী, দীন মোহাম্মদ, পতিতচন্দ্র ঘোষাল ও তৎকালীন 'বন্দে মাতরম' পত্রিকার সম্পাদক শ্রীঅরবিন্দ ঘোষ (আই.সি.এস) প্রভৃতি বিপ্লবী নেতাদের সাথে পরিচিত হন। তাদের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েই বালক ক্ষুদিরাম এবং প্রফুল্ল চাকী কিংস ফোর্ডকে বোমা ছুঁড়ে মারতে গিয়ে ভুলক্রমে নিরাপরাধ কেনেডি পরিবারের নিরীহ স্ত্রী ও কন্যাকে হত্যা করে, তিনি সে সময়ে দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছিলেন না কি হঠকারী সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের পথ বেছে নিয়েছিলেন তার মৃত্যুর একশত বছর পর সে বিচার করে আজ আর কোনো লাভ নেই। শুধু এই কথা বলা যায় যে তার দীক্ষাগুরুরা যে মন্ত্রে তাকে দীক্ষা দিয়েছিলেন পরবর্তীতে তার বিপদের সময় তাঁরা আর কেউই এই পিতৃ-মাতৃহীন অনাথ বালকের পাশে এসে দাঁড়াননি। এটা ইতিহাসের অত্যন্ত কলঙ্কজনক অধ্যায়। ক্ষুদিরাম গ্রেফতার হওয়ার পর পুলিশের ভয়ে স্থানীয় কোনো বাঙালি উকিল আদালতে তার পক্ষ সমর্থন করার জন্য সাহস ভরে এগিয়ে আসেননি। এমনকি তার নিকট আত্মীয়রাও নির্যাতিত হওয়ার ভয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ পর্যন্ত করতে আসেননি।

আশ্চর্যের কথা এই যে, তৎকালে নিগৃহীত হওয়ার ভয়ে ক্ষুদিরামের পক্ষ সমর্থনের জন্য মেদিনীপুর, কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গ থেকে কোনো উকিল যাননি। ইতিহাস থেকে জানা যায়, সর্বর্শেষে আমাদের উত্তরবঙ্গের রংপুর থেকে ৩ জন উকিল ইংরেজদের রক্তচক্ষু, নির্যাতন ও ভয়ভীতি উপেক্ষা করে ক্ষুদিরামের পক্ষালম্বনে কেস পরিচালনার জন্য সুদূর মজঃফরপুরে পাড়ি জমিয়েছিলেন। সেই স্বনামধন্য উকিলরা হলেন যথাক্রমে কুলকমল সেন, সতীশচন্দ্র চক্রবর্তী ও নগেন্দ্রনাথ লাহিড়ী।

বিপ্লবী হেমচন্দ্র কানুন গো এ প্রসঙ্গে তৎকালীন সময়ে উল্লেখ করে লিখেছিলেন বাঙালি চরিত্রের এও এক মহিমা। বিচারে রংপুরের উকিলরা যৌথভাবে জেরা করে ক্ষুদিরামকে বাঁচাবার যে চেষ্টা করেছিলেন দায়রা আদালতে আসামি ক্ষুদিরাম ও তাঁর উকিলের মধ্যে এই সময়কার একটা সংলাপই তা প্রমাণ করে। আদালতের সংলাপটি এখানে হুবহু তুলে ধরা হলো-

উকিল-তুমি কি কাউকে দেখতে চাও?

ক্ষুদিরাম-হ্যাঁ, আমি একবার মেদিনীপুর শহর দেখতে চাই। আমার দিদি অপরূপা দেবী এবং তার ছেলে পুলেদের।

উকিল-তোমার মনে কি কোনো কষ্ট আছে?

ক্ষুদিরাম-না, একেবারেই নেই।

উকিল-তোমার প্রিয়জন বা আত্মীয়-স্বজনদের কোনো কিছু জানাতে চাও কি? অথবা তোমার পক্ষে তাদের কেউ তোমাকে সাহায্য করুক, এমন ইচ্ছা তোমার হয় কি?

ক্ষুদিরাম-না! আমার কোনো ইচ্ছাই করে না, তাদেরকে কোনো কিছু জানাবার। তারা যদি স্বতস্ফূর্তভাবে ইচ্ছা করেন তাহলে আসতে পারেন।

উকিল-জেলে তোমার সঙ্গে কি রকম ব্যবহার করা হয়?

ক্ষুদিরাম-মোটামুটি ভালই।

উকিল-তোমার কি আদালতে দাঁড়িয়ে আমাদের সামনে কোনো কিছু বলতে ভয় করছে?

ক্ষুদিরাম-(স্মিতহাস্যে) ভয় করবে কেনো?

উকিল-গীতা পড়েছো?

ক্ষুদিরাম-হ্যাঁ, পড়েছি?

উকিল- তুমি কি জানো আমরা তোমার জন্য বহুদূর উত্তরবঙ্গের রংপুর জেলা থেকে তোমার পক্ষ সমর্থন করতে এখানে এসেছি? কিন্তু তুমি তো তার আগেই তোমার দোষ স্বীকার করেছো।

ক্ষুদিরাম-(স্মিতহাস্যে) কেনো করবোনা?

উপরোক্ত সংলাপটি লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, ক্ষুদিরামের নিজের জীবন রক্ষার ব্যাপারে সব আশাই ছেড়ে দিয়েছিলেন। বস্তুতঃ পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর থেকেই তিনি প্রাণের মায়া ত্যাগ করে ভাগ্যের হাতে নিজেকে সমর্পণ করে দিয়েছিলেন।

ক্ষুদিরামকে প্রাণ দন্ডাদেশ দিয়েছিলেন মজঃফরপুরের তৎকালীন অতিরিক্ত দায়রা সেশন জজ মিস্টার কানর্ডাফ। অবশ্য দন্ডাদেশপ্রাপ্ত বন্দীকে হাইকোর্টে আপীল করার সুযোগ দেয়া হয়েছিলো। আপীল পেশ করার জন্য সাতদিন সময়ও দেয়া হয়েছিলো। হাইকোর্টের আপীল মামলার বিচারপতি ছিলেন বেট এবং রিভ্স। কিন্তু হাইকোর্টের আপীল খারিজ হয়ে যাওয়ার পর ক্ষুদিরামের পক্ষ থেকে লেফটেন্যান্ট গভর্ণরের কাছে তার প্রাণভিক্ষার জন্য আবেদনপত্র পেশ করা হয়েছিলো। তার প্রাণ ভিক্ষার আবেদন পত্রটি সভ্য ইংরেজ সরকার মাঝ পথে আটক করে দিয়েছিলেন। সেটি আর গভর্ণরের কাছে পাঠানোই হয়নি। পরবর্তীতে তার প্রাণভিক্ষার আবেদন খারিজ করে মৃত্যুদন্ডই বহাল রাখা হয়েছিলো। ফলে, অদৃষ্টের নির্মম পরিহাস, পরদিন ১৯০৮ সালের ১১ আগষ্ট তারিখে বিহার প্রদেশের মজ:ফফরপুর জেলের ভিতরে ভোর ৬টার সময় ক্ষুদিরামকে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হয়। ফাঁসির মঞ্চে প্রাণ উৎসর্গকারী ক্ষুদিরাম শহীদ হন ১৯০৮ সালের ১১ আগষ্ট। দিনটি ইতিহাসের পাতায় আজও চিরঅমস্নান হয়ে রয়েছে।

সে সময় প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ থেকে জানা যায়, সবার উপস্থিতিতে তার হাত দু'খানা পিছনের দিকে রশি দ্বারা বেঁধে দেয়া হলো। একটা সবুজ রং-এর পাতলা টুপি দিয়ে তার গ্রীবামূল পর্যন্ত ঢেকে দিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে দেয়া হলো। ক্ষুদিরাম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। একটুও নড়লো না। জেলার উডম্যান সাহেব ঘড়ি দেখে একটি রুমাল উড়িয়ে দিলেন। প্রহরী মঞ্চের একপ্রান্ত থেকে একটা হ্যান্ডেল টেনে দিলো। ক্ষুদিরাম নিচের দিকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। কেবল কয়েক সেকেন্ড ধরে উপরের দড়িটা একটু নড়তে লাগলো। তারপর সব স্থির। ফাঁসির এক ঘন্টা পরে জেলসুপার পাটাতন পরীক্ষা করে ক্ষুদিরামের দেহ বাইরে এনে মৃতদেহ সৎকারের জন্য আত্মীয়-স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করলেন। অবিভক্ত ভারতবর্ষের মুক্তি আন্দোলনের আরো একজন বীর সৈনিক শহীদ হলেন। ক্ষুদিরামের ফাঁসির প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তারই বড়বোন অপরূপা দেবী বলেছিলেন, 'তিনমুঠো ক্ষুদ দিয়ে ক্ষুদিরামকে কিনেছিলাম আমি। মনে মনে লোভ ছিল ক্ষুদিরামকে একা ভোগদখল করবো। কিন্তু কখন যে, আমার আগোচরে সে দেশের লোকের কাছে বিকিয়ে গেছে, জানতেও পারিনি। তিনমুঠো ক্ষুদ দিয়ে আমি কিনেছিলাম, দেশের ছেলেরা তাকে কিনলো আঁজলা আঁজলা রক্ত দিয়ে।'

ক্ষুদিরামের ফাঁসির সময় সরেজমিনে কারা প্রাঙ্গনে উপস্থিত ছিলেন মজ:ফরপুরের জেলা প্রশাসক, পুলিশসুপার, জনৈক ডি.এস.পি, কিছু পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য। এছাড়াও ফাঁসির মঞ্চে, বধ্যভূমিতে উপস্থিত ছিলেন দু'জন ইউরোপীয়, দু'জন বাঙালি এবং দু'জন বিহারী দর্শক। জেল থেকে শ্মশান পর্যন্ত রাস্তার দু'ধারে কিছুদূর অন্তর অন্তর দাঁড়িয়েছিল পুলিশ প্রহরী, শহরের অগণিত লোক ভিড় করেছিল। অনেকে মৃতদেহের উপর ফুল দিয়ে গেলো। শ্মশানেও অনেক ফুল আসতে লাগলো। একজন সাব-ইন্সপেক্টরের নেতৃত্বে ১২ জন পুলিশ শ্মশানের এক প্রান্তে বসে ছিলো । গন্ডক নদীর তীরে তার নিঃশব্দ অন্ত্যোষ্টি ক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল।

উকিলের কাছে আলোচনা প্রসঙ্গে সেকালে ক্ষুদিরাম বলেছিলেন যে, তার মনে কোন কষ্ট নেই। কিন্তু তার বিচার ও ফাঁসির কাহিনী শোনার পর আজ এই একশ বছর পরে আমাদের দেশবাসীর মনে হয়তো কষ্ট লাগে। কষ্ট এই জন্য যে, বিচারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এই অবোধ বালকটির হয়ে আইনের লড়াই চালানোর জন্য কেউই আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। অসহায় কিশোরটিকে আদালতে সী্বকারোক্তি দিতে নিষেধ করার মতো যদি অন্তত: একজনও কেউ সে সময়ে তার পাশে দাঁড়াতেন তা'হলে হয়তো তার প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হতো। অথচ পিতৃ-মাতৃহীন, অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং পরান্নে লালিত এই অসহায় কিশোরটিকে যারা বা যে দল বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত করেছিলেন তারা তার প্রাণ বাঁচানোর জন্য কেউ এগিয়ে আসেননি। অবিভক্ত বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনের এটাই সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি। কোথায় ছিল তখন তার দীক্ষা গুরুরা ?

বাংলার এই দুরন্ত-কিশোর ক্ষুদিরাম ছিলেন একাধারে শিশুর মতো সরল অথচ বজ্রের মতো কঠোর ও অসম সাহসী এক যোদ্ধা। রাজনীতিতে তার উল্কার মতো আত্মপ্রকাশ আবার উল্কার মতোই মহাপ্রয়াণ।

ক্ষুদিরাম সে যুুগের রূপকথার অগি্নপুরুষ ছিলেন। তিনি সেকালে অত্যাচারী ব্রিটিশ দৈত্যের সঙ্গে আধুনিক অস্ত্র নিয়ে লড়াই করেছেন। ক্ষুদিরাম জানতেন শত্রুকে ঘৃণা না করলে সৈনিক হওয়া যায়না আর মানুষকে ভালো না বাসলে বিপ্লবী হওয়া যায়না। বুকভরা ভালোবাসা নিয়েই ক্ষুদিরাম বিপ্লবের পথে এসেছিলেন। তাই তিনি ছিলেন সেকালের একজন আদর্শ বিপ্লবী।

অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে সশস্ত্র পথে স্বাধীনতা আনার স্বপ্নবীজ ক্ষুদিরামসহ আরও অনেক তরুণের মধ্যে সে সময় বুনে দেয়া হয়েছিল। সশস্ত্র সংগ্রামীদের দমনে ব্রিটিশ সরকার চরম পন্থা অবলম্বন করেছিল। একই পথ ধরে ত্রিশের দশকে মাষ্টার দা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে সংঘটিত হয়েছিল উপমহাদেশের স্মরণীয় ইতিহাস। ব্রিটিশদের পযুর্দস্ত করে তিন দিন চট্টগ্রাম কে বিপ্লবীরা স্বাধীন করে রেখেছিলেন। মাষ্টার দা'র নেতৃত্বে সশস্ত্র বিপ্লবী স্বাধীনতা সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করেছিল বৈকি। সূর্যসেনকেও ফাঁসির মালা কণ্ঠে ধারণ করতে হয়েছিল। শুধু তাঁরাই নন, তাঁদের আরও অনেক সহযোদ্ধা ফাঁসি অথবা গুলিতে মারা গেছেন। ইতিহাস ক্ষুদিরাম, প্রফুল্লচাকী ও সূর্যসেনের আত্মদানকে গুরুত্ব দিয়েছে।

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলনে ক্ষুদিরামের গানে আত্মদান উচ্চারিত হয়েছে প্রেরণার অংশ হিসেবে।

ষাট-সত্তর দশকে তারুণ্যের কাছে ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকীর আত্মদানের উৎস ছিল প্রেরণার অন্যতম নাম। ১৮ বছর বয়সীর কাছে ক্ষুদিরাম সাহসের বরাভয় হয়ে থাকতে পারেন হয়তো একুশ শতকে। গান হয়ে আরও অনেক দিন বেজে উঠবেন 'একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি'।

মো: জোবায়ের আলী জুয়েল : কলামিস্ট

এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আনার মতামত দিন।
মতামত দিতে চাইলে অনুগ্রহ করে করুন।
আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন।
সর্বাধিক পঠিত
ফটো গ্যালারি
আজকের পত্রিকা
আজকের নামাজের সময়সূচীসেপ্টেম্বর - ২২
ফজর৪:৩২
যোহর১১:৫২
আসর৪:১৪
মাগরিব৫:৫৮
এশা৭:১১
সূর্যোদয় - ৫:৪৭সূর্যাস্ত - ০৫:৫৩
পুরোন সংখ্যা
বছর : মাস :
আজকের পাঠকসংখ্যা
৪৪৩৪.০
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতিঃ সৈয়দ এম. আলতাফ হোসাইন। সম্পাদক : আহ্সান উল্লাহ্। প্রকাশক ছৈয়দ আন্ওয়ার কর্তৃক রোমাক্স লিমিটেড, তেজগাঁও শিল্প এলাকা থেকে মুদ্রিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : খলিল ম্যানশন (৩য়, ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলা), ১৪৯/এ, ডিআইটি এক্সটেনশন এভিনিউ, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত। ফোন : ৯৩৫৭৭৩০ (বার্তা), ৮৩১৫৬৪৯ (বাণিজ্যিক), ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪.
ই-মেইলঃ djanata123@gmail.com, bishu.janata@gmail.com
ফোনঃ ০২৮৩১৫১১৫, ০২৮৩১৫৬৪৯ ফ্যাক্সঃ ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪
Copyright The Dainik Janata © 2010 Developed By : orangebd.com.