নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা, বুধবার, ৯ অক্টোবর ২০১৯, ২৪ আশ্বিন ১৪২৬, ৯ সফর ১৪৪১
ভালো নেই বাংলাদেশ
মোহাম্মদ অংকন
'ভালো নেই বাংলাদেশ' শব্দবন্ধটি শুনলে ক্ষমতাসীন নেতাকর্মী, দুর্নীতির সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত সরকারি চাকরিজীবী, লোক দেখানো দেশপ্রেমিকদের রাগ ও ক্ষোভ দেখা দিতে পারে। এটি অস্বাভাবিক কিছু নয়, এমনটি হয়েছেও আমার সাথে। আমি মূলত সমসাময়িক নানা ইস্যুতে চার লাইনের ছড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসুবকে লিখে থাকি। হ্যাস ট্যাগ (# ঞধম) দিয়ে লিখি 'ভালো নেই বাংলাদেশ'। এর বিশেষ পাঠকপ্রিয়তা রয়েছে। তবে সম্প্রতি এ নিয়ে আমাদের নাটোর জেলার এক নেতা, একই সাথে সরকারি চাকরিজীবী (দুর্নীতি করেন কিনা, খোঁজ নিলে বের হয়ে আসবে, আপাতত এটুকুই) চড়াও হয়ে বসলেন। তিনি বলে উঠলেন, 'কোথায় ভালো নেই বাংলাদেশ? দেশের উন্নয়ন কি আপনাদের চোখে পড়ে না? আপনারা দেশের বড় শত্রু। দেশের খেয়ে দেশের দুুর্নাম করতে লজ্জা করে না আপনাদের? আপনাদের কারণে দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।' আরও নানাবিধ কটু কথা। আমার উত্তর ছিল, 'আমি কখনও দেশের উন্নয়নের বিপক্ষে নই। দেশে উন্নয়ন যথেষ্ট হচ্ছে, আরও হোক, চাই। কিন্তু দুর্নীতি কি হচ্ছে না? দুর্নীতির সার্বিক পরিস্থিতিতে দেশ কি আসলেই ভালো আছে? দুর্নীতির সাথে তাল মিলিয়ে দেশের উন্নয়ন চলমান থাকাকে দেশের ভালো থাকা বলে না।' আরও নানাবিধ যৌক্তিক কথা। দুর্নীতির কথা শুনলে স্বাভাবিকই যে কারও রাগ লোপ পাওয়ার কথা। এটি বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে স্বীকার্য, প্রমাণিত। সুস্থ মস্তিষ্ক হলে সঠিক ভাবনার উদয় ঘটবে বটে। এক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। দেশে দুর্নীতির চালচিত্র ভয়াবহ. কে জানে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসুবকে লিখেছিলাম,

'চুনোপুঁটি থেকে রাঘব বোয়াল/করছে সবাই দুর্নীতি,/নইলে কী আর দেশের এ হাল/হয় কী এমন দুর্গতি?'

কতিপয় ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায়, অফিস আদালতে এই পন্থীদের উপস্থিতিতে দুর্নীতি সংঘটনের বিষয়টি যেন 'রক্ষক হয়ে ভক্ষক'র মতো। বিবিসি'র প্রতিবেদন বলছে, 'দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের 'বিব্রতকর' অবনতি হয়েছে। তার মানে শুধু আমিই বলছি না যে 'ভালো নেই বাংলাদেশ।' দুর্নীতি বিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল আমার সাথে এক মত! নাকি আমি তাদের সাথে এক মত! তারাও যে বলছে, 'বিশ্বজুড়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশ এবার আরো খারাপ অবস্থানে গেছে।' সংস্থাটির প্রতিবেদনে এসেছে, ২০১৮ সালে দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের ফলাফল ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৪৯তম অবস্থানে। অথচ ২০১৭ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৩তম। বাংলাদেশের স্কোর ১০০'র মধ্যে ২৬, যেটি ২০১৭ সালের চেয়ে দুই পয়েন্ট কম। অর্থাৎ শতকরা হারে বাংলাদেশের দুই পয়েন্ট অবনতি হয়েছে।' বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কি হবে, বলুন! মাত্র তো দুই পয়েন্ট কমেছে! একজন স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীর যদি প্রতি বছর এরকম ডিমোশন হতে থাকত, বছর বছর মাত্র দুই পয়েন্টের জন্য জিপিএ-৫ না পেত, পরিবার তার কি হাল করত, একবার ভেবে দেখা যেতে পারে! আসলে জিপিএ-৫ পাওয়ানোর লক্ষ্যে পরিবারে সন্তানের প্রতি মা-বাবার শাসন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা থাকলেও দেশের দুর্নীতির প্রতিকারে শাসন নেই, নেই কোনো জোরালো ব্যবস্থা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনো 'একশন'ই যেন কার্যক্রর হয় না বা দুর্নীতি বিরোধী উদ্যোগই নেয়া হয় না। দু'চার জন 'রাঘব বোয়াল'কে আটক করে বাকিদের সতর্ক হওয়ার সুযোগ দেয়ার মাধ্যমে বলা হয় যে কৌশল বদলিয়ে দুর্নীতি করুন। দেশের উন্নয়নের কথা প্রচার হলেও উন্নতির কথা স্বীকার করতে বড্ড লজ্জা লাগে। তখন রাগ দেখানো ছাড়া, ক্ষমতার অপব্যবহার করা ছাড়া অন্য কোনো পথ পাওয়া যায় না। আমি অমুক কর্মকর্তা, অমুক নেতা! তাতে যদি সত্যবাদিরা একটু ভরকে যায়, দুর্নীতিতে টিকে থাকা ইতিবাচকই হবে বলে আশা করা যেতে পারে।

কৌতুকের ছলে হলেও বলা যায়, ধরুন- একজন সরকারি কর্মকর্তা একটা দুর্নীতি করার স্কোপ (সুযোগ) পেয়েছেন। অফিসের আরেকজন বলছেন, 'আমরা তো একই পদের। তাই 'ফিফটি ফিফটি' হোক, ভাই।' প্রথমজন বলছেন, 'না আমি একাই গিলব। আপনি পরেরবার সুযোগ খুঁজুন, ভাই!' দুর্নীতির এই যে ক্রমধারা, এই যে অসম প্রতিযোগিতা, এই যে ভাগবাটোয়ারার প্রবণতা, আসন্ন দুর্নীতির জন্য ফাঁদ পেতে বসে থাকা এসব আজ সর্বত্র। একে অপরের দেখাদেখি করেই দুর্নীতিতে জড়াচ্ছে অধিকাংশ। 'ও আমার থেকে নিচের পদে হয়েও দুর্নীতি করছে, আমি কেন করব না?' সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয়টা হলো, উভয়ই দেখছে দুর্নীতি করলে কোনো শাস্তি পেতে হচ্ছে না বা আইনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে না, এ সম্ভাবনা কম এই ভেবে যে আমি ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক। নিজেদের বলয়ের প্রাণী হওয়ায় খুব দ্রুত বিষয়গুলো 'ধামাচাপা' দেয়া সম্ভব হচ্ছে। আর বেশির ভাগ অফিসের দুর্নীতির চিত্র বাইরে আসার সুযোগ নেই। সংবাদকর্মীরা আজ তথ্য অধিকার থেকে চরমভাবে বঞ্চিত, হেনস্তার শিকার, অনিরাপত্তা এবং মৃত্যু ভয় পেছনে পেছনে ছুটছে। (সাংবাদিকদের কল্যাণে সম্প্রতি কিছু দুর্নীতির হালচাল গণমাধ্যমে আসায় দুর্নীতির মাত্রাটা বর্তমানে কতটা তীব্রতর, একটু হলেও উপলব্ধি করা যাচ্ছে। সরকারি প্রজেক্টসমূহে যে অপরিকল্পিত ব্যয় নির্ধারণ করে জনগণকে ধোঁকা দেয়া হচ্ছে, তা অবিশ্বাস্য। চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বালিশের দাম ধরা হয়েছে ২৭০০০ টাকা এবং তার কভারের দাম ২৮০০০ টাকা! দুর্নীতিতেও এমন অসঙ্গতি যে বাঁশের চেয়ে কঞ্চি বড়!) বরং যে বা যারা যত দুর্নীতি করছে, অফিস আদালতে তার বা তাদের তত বেশি 'র‌্যাংক'। অঢেল টাকার মালিক হলে যা হয় আরকি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লিখেছিলাম-

'দুর্নীতির কালো থাবায়/করছে বাড়ি, গড়ছে টাকার পাহাড়,/ধরছে না কেউ ওদের/বরং পাচ্ছে বড় পদ-পদবি উপহার!'

মাত্র ক'দিন আগে প্রথম আলো'তে আনিসুল হক স্যারের একটি কলাম পড়লাম। তিনি লিখেছেন, 'দুর্নীতির কারণেই এই দেশে ভয়াবহ বেকারত্বের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। টাকা লুট হচ্ছে, সেই টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে, ফলে দেশে আশানুরূপ বিনিয়োগ হচ্ছে না, কর্মসংস্থান হচ্ছে না। অর্থনীতিতে আরেক নতুন ধাঁধা দেখা দিয়েছে : প্রবৃদ্ধি আছে, কিন্তু বেকারত্ব বাড়ছে কেন? কাজের সুযোগ কেন সৃষ্টি হচ্ছে না? দুর্নীতির কারণেই খেলাপি ঋণ বাড়ছে। কোটি কোটি টাকা কোনো একটা কলকারখানার নামে ঋণ নিয়ে যিনি শোধ করছেন না, তিনি তো আসলে সেই টাকা দেশে বিনিয়োগ করেননি, বিদেশে পাচার করেছেন, ফলে কর্মসংস্থান হবে কী করে? দুর্নীতির দাবানলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদেশে টাকা পাচার। তার কারণও দুর্নীতি। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত টাকা দুর্নীতিবাজ নেতা বা কর্মকর্তা বা ব্যবসায়ী বা লুটেরা কেন দেশে রাখবেন?' দেশের এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে তিনি যে যৌক্তিক কথাগুলো লিখে ফেলেছেন, তার জন্য কতজন যে গালি দিয়েছে, রাগ-ক্ষোভ প্রকাশ করেছে, তার ইয়েত্তা নেই। স্যালুট জানানোর সংখ্যাও কম নয় বলে দ্ব্যর্থহীনভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে এমন লেখা যায়। উল্লেখিত এ জাতীয় কিছু ক্ষেত্রে চোখ মেললে লক্ষ্য করা যাবে, দুর্নীতির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াটা 'অ্যান্টিবায়োটিক'র চেয়েও মারাত্মক! সরকারপন্থী কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত 'অ্যান্টিবায়োটিক' যেমন দেশের দুর্নীতি সাধন করছে, তেমনই ক্ষমতাসীন দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠনসমূহের নেতাদের সাম্প্রতিক দুর্নীতির যে 'সিনেমা' রিলিজ (মুক্তি) পেয়েছে, তা দেখে দেশের জনগণ যতটা না বিস্মিত, তার চেয়ে বিস্মিত বড় বড় পদধারী কর্তারা! বিষয়টি এমন যে আমি আর কি দুর্নীতি করি, আমার শিষ্যরাই তো চ্যাম্পিয়ন! সাধারণ ছাত্রলীগ কর্মী হয়ে শত শত কোটি টাকার মালিক হওয়া, যুবলীগের পদ-পদবি নিয়ে 'ক্যাসিনো' বিজনেস পরিচালনা, টেন্ডারবাজি, মানিলন্ডারিং করা যেন ছোট ছোট দুর্নীতিরই স্থিরচিত্র মাত্র! আরও কোথায় বড় বড় কি হচ্ছে, তা আমরা কি আর জানি! জানার অধিকারও নেই! গরমিলের বদৌলতে ঘরের খবর যখন বাইরে চলে আসে, কেবল একটু আলোচনার ফুসরত মেলে তখন।

বর্তমানে রাজনৈতিক কর্মীদের বিশেষ করে আওয়ামী লীগপন্থীদের সেস্নাগান- 'আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে।' কিন্তু ঘেটে দেখলে বেরিয়ে আসবে বা আসছে যে তারাই সবচেয়ে দুর্নীতির শীর্ষে, এটি অভিযোগ নয়, বরং রূঢ় বাস্তবতা। তারা মুখে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কথা বলে, কিন্তু সশরীরে করে তার বিপরীত, এটি এখন প্রমাণিত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, 'আমার কৃষক দুর্নীতিবাজ? না। আমার শ্রমিক? না। তাহলে ঘুষ খায় কারা? বস্ন্যাকমার্কেটিং করে কারা? বিদেশি এজেন্ট হয় কারা? বিদেশে টাকা চালান দেয় কারা? হোর্ড করে কারা? এই আমরা, যারা শতকরা ৫ জন শিক্ষিত। এই আমাদের মধ্যেই ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ।' তাহলে তার ভাষ্য অনুযায়ী, কতিপয় শিক্ষিতরা আমাদের দেশকে ভালো থাকতে দিচ্ছে না। তারাই দিনের আলোতে দুর্নীতি করছেন, রাতের আঁধারে ঢাকছেন। রাতারাতি কোটিপতি হচ্ছেন, সুইচ ব্যাংকে একাউন্ট খোলা হচ্ছে! বিদেশে স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীর নামে পাঠানো হচ্ছে মাত্র ১৩২ কোটি টাকা! নিজের নামে বাড়ি-গাড়ি কেনার পর কেনা হচ্ছে মৃত বাবা-মার নামে, যাতে তাদের জবাদিহি করা না লাগে, সে সুযোগ কই! এসব থেকে আমরা যেহেতু বুঝতে পারছি, কারা দেশের মঙ্গলের বিপক্ষে, কারা দুর্নীতির সাথে অতপ্রোতভাবে জড়িত, তাদের কেন ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখা হচ্ছে? কেন তাদের সুযোগ দেয়া হচ্ছে বারবার? সরকারি অফিস-আদালত-কর্মক্ষেত্রে 'জিরো টলারেন্স' নীতি গ্রহণ করা হোক, যে দুর্নীতিবাজকে চিহ্নিত করে দিবে, তাকে পুরস্কার দেয়া হবে- এমন ঘোষণা আসলে অন্তত দুর্নীতির কিছু ছাপচিত্র চোখে পড়ত। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন দ্বিগুণ করা হলো যাতে তারা দুর্নীতি না করে। কিন্তু 'যেই লাউ, সেই কদু' হলো। বিপরীতে দেশের অর্থনীতির সাথে সরাসরি জড়িত মানুষগুলোর কপাল পুড়ল। চালের দাম ৬০ টাকার উপরে থাকছে সারা বছর। সবজির বাজারে সারা বছর আগুন! আজকাল পেঁয়াজও কিনতে হচ্ছে মাত্র ১২০ টাকা দরে! এর বড় লভাংশ যাচ্ছে কতিপয় রাজনৈতিক নেতাদের বস্তার মতো পকেটে, কতিপয় প্রশাসনের বিকল্প পকেটে যাদের লেনদেনের অংকের পরিমাণ শুনলে আঁতকে উঠতে হয়। দেশজুড়ে গড়ে উঠেছে 'সিন্ডিকেট'। সবকিছুতেই সিন্ডিকেট আর সিন্ডিকেট। এদের নেটওয়ার্কের বিস্তার 'ফাইভ-জি' ছাড়িয়েছে!

আমরা প্রায়ই দেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযানের নানা প্রতিশ্রুতি শুনে থাকি, হয়ও দু'চারটে অভিযান কালেভদ্রে, তোপের মুখে থেমেও যায় সেগুলো। ম্যাজিস্ট্রেটকে ক্ষমতা দিলেও উপর মহলের হুকুম ছাড়া তারা কোনো অভিযান পরিচালনা করতে পারেন না। ক'দিন আগেও ক্ষমতাসীন দলের নেত্রী শেখ হাসিনা বললেন, 'দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চলছে এবং চলবে। দুর্নীতির কোনো তথ্য পেলেই আমরা এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি, আমরা জাতীয় নিরাপত্তা সেল গঠন করেছি এবং তাদের সময়মতো নির্দেশনা প্রদান করছি। এই অভিযান চলতে থাকবে এই নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই।' তার কথায় আমরা দুশ্চিন্তামুক্ত হতে পারি কতটুকু? দলের একজন মন্ত্রী বললেন, 'শেখ হাসিনা ছাড়া সবাই দুর্নীতি করে।' তিনি যথেষ্ট সত্য কথাটা বলে ফেলেছেন। (তার কিন্তু মন্ত্রিত্ব যায়নি, এক পুলিশ অফিসার যখন বললেন, কেউ একজন ১৮০ কোটি দুর্নীতি করেছে, তখনই বরখাস্ত হলেন।) নিজের দোষ একার ঘাড়ে আসুক, তা কেউই চায় না। মরব তো সবাইকে নিয়েই মরব! কিন্তু সবাইকে মারা তো আর এত সহজ নয়, কেউই মরছেও না তাই। স্ববিরোধী আমরা কেউই নই। নিজে কলুষযুক্ত হয়ে অন্যকে কেমনে বলি কলুষমুক্ত হও! আর এজন্য দেশে যতই দুর্নীতি বিরোধী অভিযান হোক না কেন, যতই সুদ্ধি অভিযান পরিচালিত হোক না কেন, দুর্নীতি নির্মূল হচ্ছে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লিখেছিলাম-'শুদ্ধি অভিযানের নামে/লোম বাছতে কম্বল উজাড় নয়,/শাকে ঢাকছে কিনা মাছ/এটিও জনগণের দেখার বিষয়।'

আমাদের দেশের জন্য বর্তমানে প্রধান চালেঞ্জ- 'দুর্নীতি প্রতিরোধ করা।' এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারলে সরকারের গৃহীত উন্নয়ন চিত্রকর্মগুলো জনসম্মুখে আসবে নিশ্চিত। তাই দুর্নীতি প্রতিরোধে করণীয় নিয়ে ভাবতে হবে। আমরা দেখি, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোথাও যে বড় বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি সংঘটিত হয়, সেখানে কিছু সৎ, সাহসী কর্মকর্তা এ সকল দুর্নীতিতে বাধা সৃষ্টি করে, তাদের হেনস্তার শিকার হতে হয়, এর কোনো প্রতিকার হয় না, তারা হারিয়ে যায় অতলে। সম্প্রতি র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সরোওয়ার আলমের দুর্নীতি ও ভেজালের বিরুদ্ধে একচ্ছত্র পদচারণা লক্ষ্য করা গেছে। এর মূলে কাজ করেছে সততা ও সৎ সাহসিকতা, যেটি তিনি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারেও উল্লেখ করেছেন। আসলে এ জাতীয় লোকেরাই দুর্নীতির প্রতিরোধে মূল ভূমিকা পালন করতে পারেন। এজন্য সরকার থেকে তাদের সুরক্ষা দিতে হবে। নইলে তারাও হারিয়ে যাবেন। দেশে অসংখ্য যোগ্য, সৎ কর্মকর্তা বর্তমানে কোণঠাসা হয়ে আছেন, তাদের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে। তাদের সুরক্ষা দেয়া হলে অনিয়ম, দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের ভিতরেই একটি স্বতস্ফূর্ত প্রতিরোধ শক্তি তৈরি হবে। যারা অন্যায়, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের খোঁজ করতে হবে। এ সকল ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের নিকট থেকে এ বিষয়ে তাদের অভিজ্ঞতার তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। স্বপ্রণোদিত হয়ে অনেকেই এগিয়ে আসবেন এবং এতে একটি অজানা চিত্র পাওয়া যাবে যা ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হবে। দুর্নীতি দমনে যারা কোনো রকম অবদান রাখবেন, তাদের পুরস্কারের ব্যবস্থা করতে হবে। ভালো কাজের জন্য স্বীকৃতি হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশংসাও চাকরিজীবীদের জন্য বড় পুরস্কার। সংবর্ধনার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান তাদের নিজস্ব বিধিবদ্ধ আইন দ্বারা তাদের কর্মকর্তাদের অপরাধের শাস্তি বিধান করবে এবং কেবল প্রয়োজন হলেই দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠাবে। দুঃখজনক হলেও সত্য দুদকের অবস্থাই আজ নড়বড়ে, এর ভেতরেই চলছে রমরমা দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য, অসংখ্য দুদক কর্মকতা দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত রয়েছেন। তদন্ত করলে আরও যে কত জনের নাম বেরিয়ে আসবে তার সুস্পষ্ট ধারণা আমাদের নেই।

পরিশেষে, দুর্নীতি আমাদের পচন ধরিয়েছে মাথায়। কোনো বিশেষ অঙ্গে হলে না হয় স্বদিচ্ছায় কেটে ফেলা যেত! মাথা তো আর কেটে ফেলা সম্ভব নয়, দরকার সুচিকিৎসা যা দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধারী ব্যক্তিই পারবেন যার নির্দেশনা অমান্য করার এখতিয়ার কারও আছে বলে মনে হয় না এবং তিনি সব বিষয়েই জানেন যে কোথায় কি ঘটছে। তাই দুর্নীতি প্রতিরোধের দায়িত্বটা সরকার প্রধানকেই নিতে হবে, এ বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে এ প্রেক্ষিতে যে তার তো দুর্নীতি করার কোনো প্রয়োজনীয়তা দেখছি না, তবে তিনি কেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হবেন না? 'দেশের ক্যান্সার' দুর্নীতি প্রতিরোধে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে সকলের। স্ব-স্ব অবস্থান থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে, আওয়াজ তুলতে হবে- দুর্নীতিমুক্ত সোনার বাংলাদেশ চাই। তবেই বাংলাদেশ ভালো হয়ে উঠবে একদিন। আমাদের কখনই আপসোস করে বলতে হবে না- 'ভালো নেই বাংলাদেশ।'

মোহাম্মদ অংকন : কলামিস্ট

এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আনার মতামত দিন।
মতামত দিতে চাইলে অনুগ্রহ করে করুন।
আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন।
সর্বাধিক পঠিত
ফটো গ্যালারি
আজকের পত্রিকা
আজকের নামাজের সময়সূচীঅক্টোবর - ১৪
ফজর৪:৩৯
যোহর১১:৪৫
আসর৩:৫৫
মাগরিব৫:৩৭
এশা৬:৪৮
সূর্যোদয় - ৫:৫৫সূর্যাস্ত - ০৫:৩২
পুরোন সংখ্যা
বছর : মাস :
আজকের পাঠকসংখ্যা
২৭২৮.০
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতিঃ সৈয়দ এম. আলতাফ হোসাইন। সম্পাদক : আহ্সান উল্লাহ্। উপদেষ্টা সম্পাদক : মোঃ শাহাবুদ্দিন শিকদার। প্রকাশক ছৈয়দ আন্ওয়ার কর্তৃক রোমাক্স লিমিটেড, তেজগাঁও শিল্প এলাকা থেকে মুদ্রিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : খলিল ম্যানশন (৩য়, ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলা), ১৪৯/এ, ডিআইটি এক্সটেনশন এভিনিউ, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত। ফোন : ৯৩৫৭৭৩০ (বার্তা), ৮৩১৫৬৪৯ (বাণিজ্যিক), ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪.
ই-মেইলঃ djanata123@gmail.com, bishu.janata@gmail.com
ফোনঃ ০২৮৩১৫১১৫, ০২৮৩১৫৬৪৯ ফ্যাক্সঃ ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪
Copyright The Dainik Janata © 2010 Developed By : orangebd.com.