নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা, রোববার ১৮ অক্টোবর ২০২০, ২ কার্তিক ১৪২৭, ৩০ সফর ১৪৪২
এ সপ্তাহের গল্প
অমল দা
মোহাম্মদ অংকন
'একটা জনতা রাখবেন।'
এটুকু বললেই অমল দা বুঝে ফেলেন আজকে প্রকাশিত দৈনিক জনতা পত্রিকার এক কপি রাখতে হবে। কয় সেকেন্ড সময় যায়? কয় পয়সা ফুরায় মোবাইলে? কিন্তু দু'জনের মধ্যে কমিউনিকেশনের একটা বোঝাপড়া এতদিনে হয়ে গেছে, তা যে কেউ আন্দাজ করতে পারবে। তিনি ঠিকঠাক পত্রিকা রেখে দেন। জানেন, আমি নিবই। হয়ত ভার্সিটি থেকে ফেরার পথে, নয়ত বাসে ওঠার পথে। যেদিন ভার্সিটি থাকে না, সেদিন আর নেয়া হয় না। পরের দিন নিতে হয়। ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে গেলে, সেখান থেকে ফোন করলেও তিনি পত্রিকা রেখে দেন। কখনো তাঁর ভুল হয় না। মাঝেমাঝে আমি অবাক হই, তিনি শুধু পত্রিকাই রাখেন না, আমার প্রকাশিত লেখাগুলোও পড়েন। এটা ভাবেন যে কী এমন গুরুত্বপূর্ণ লেখা ছাপা হয়েছে যে আমি তাকে ফোন করে পত্রিকা রাখতে বলি, হয়ত। অথবা তিনি আমার একজন পাঠক হতে চান। পত্রিকা নেয়ার সময় দেখা হলে তিনি অকপটে বলেন, 'গল্পডা ভালা হইছে। আমারে নিয়া কিছু লেহেন না?'

অলম দা'র সাথে পত্রিকা কেনাকাটা থেকেই পরিচয়। নতুন এয়ারপোর্টের বিপরীত পাশে তাঁর স্টল। মেইনরোড বেয়ে গেছে। রাঁ রাঁ করে পাবলিক বাসগুলো যাচ্ছে। কোনোটা সিস্নপকেটে থামছে, হুড়মুড় করে যাত্রী নামছে, কোনোটা গাদাগাদি করে যাত্রী উঠাচ্ছে। এরই মাঝে যাত্রীরা পত্রিকা কিনছে। রিস্ক নিয়ে তাঁর আর বাসে উঠতে হচ্ছে না। বলতে হচ্ছে না, 'পত্রিকা লাগবে? আজকের তাজা খবর? বাংলাদেশ প্রতিদিন পাঁচ টাকা, প্রথম আলো দশ টাকা।' বরং মানুষজন স্বেচ্ছায় স্টল থেকে পত্রিকা কিনছে। ওদিকে রোদ-তাপ এসে অমল দা'র শরীরে লাগছে। শহরের রাস্তার ধুলোবালি ঘামের সাথে মিশে সমস্ত শরীর কালো হয়ে ওঠে। স্বাস্থ্যবান মানুষ। মিশকালো দেখা যায়। বড় একটা ছাতায় সামান্য রোদ মানলেও সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি ধুলোবালি এসে লাগে তাঁর চোখ-মুখ-শরীরে, এটা মানা করার জো নেই। তাকে তো ব্যবসা করতে হবে। বরং তিনি ব্যবসার জন্য ভালো একটা জায়াগা সিলেক্ট করতে পেরেছেন। (জানি না, তাকে কত টাকা চাঁদা দিতে হয়।) মাঝেমধ্যে লোকটার জন্য আমার ভীষণ মায়া হয়। নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করি, 'দিনে কতগুলো পত্রিকা বিক্রি হয়, কতগুলো বই বিক্রি হয়? আজকাল তো মানুষ পত্রিকা পড়ে না। ফেসবুকের খবর বিশ্বাস করে। গুজব ছড়ায়। বেশি বিক্রি হোক আর কম বিক্রি হোক, এই ব্যবসা করে ঢাকা শহরে তিনি চলেন কেমনে?' তাকে কোনো দিন প্রশ্ন করা হয়নি। যদি মন খারাপ করেন। তবে ভেবে রেখেছি, সুযোগ পেলে তাকে সাহায্য-সহযোগিতা করব। লোকটার জন্য সামান্য কিছু করতে পারলে নিজেকে হালকা মনে হবে। প্রায় দিন কথাবার্তা বলায় একটা আন্তরিকতার জায়গা তৈরি হয়েছে।

অমল দা-কে অনেকবারই পরীক্ষা করার সুযোগ হয়েছে আমার। এই যেমন, যায়য়ায়দিন পত্রিকার দাম আট টাকা। তাকে যদি দশ টাকা দিই, তিনি দুই টাকা ফেরত দিবেনই। যদি বলি, দু-তিন দিন আপনার দোকানে রেখেছিলেন, বেঁচা বাদ দিয়ে আমার ফোন ধরেছিলেন, দুই টাকা বেশি নেন, তবুও তিনি নিতেন না। বলতেন, 'এইডা আমার ব্যবসা। আমি বেশি নিয়া দায় থাহুম না। দুই দিন, তিন দিন, দশ দিন থাকলেও সমেস্যা নেই।'

অনেক সময় তিন-চারটে পত্রিকা নিলেও এমন দুই টাকা, তিন টাকা খুচরা ফেরত দিতে হয় তাকে। আমি তাকে রেখে দিতে বললেও রাখেন না। আমি এমনটা প্রায় দিন করলেও প্রথম দু-এক দিনেই বুঝে ফেলেছিলাম, অমল দা-কে পোশাক-পরিচ্ছদে, চেহারায় গরিব দেখালেও, তিনি মানসিকভাবে গরিব না। নচেত তিনি সবার দেয়া বাড়তি টাকাগুলো রাখতেন। পাঁচ টাকার পত্রিকায় কয় টাকা লাভ হয়? বাড়তি দু'চার টাকা আসলে লাভের অংকটা বড় হলো। কিন্তু তিনি তা কখনই করেন না। আসলে টাকার অংকটা বড় না হলেও তাকে আমি সম্মান করি, কিন্তু উল্টো তিনি আমাকে সম্মান করেন। নিজের মধ্যে সামান্যতম লোভ তাঁর নেই। এক্কেবারে মাটির মানুষ। শহরের ধুলোবালি তাঁর শরীরে লেগে খাঁটি মাটির মানুষ হয়ে গেছেন। অমল দা'র ছোট ছোট কথা আমার খুব ভালো লাগে। সামান্য সময় পেলে তাঁর সাথে গল্প করি। ছবি তুলি। আর ভাবি, তাঁর কথাটা রাখব। তাকে নিয়ে কিছু লিখব পত্রিকায়। যেদিন তাকে নিয়ে লেখা ছাপা হবে, তিনি যে কত খুশি হবেন, তা ভাবতে আমার এখনই আনন্দ লাগে। দেড় যুগ সময় ধরে পত্রিকা বেঁচলেও, হাজার মানুষের নিউজ পত্রিকায় পড়লেও, নিজের নামটা কখনো পত্রিকায় দেখেননি। এটা তাঁর ইচ্ছাও বটে।

যে কথা বলছিলাম। সুযোগ পেলে অমল দা-কে সাহায্য-সহযোগিতা করব। হ্যাঁ, অনেক দিনের প্ল্যান আমার এটি। হঠাৎ এই সুযোগটা এবার হলো। বিষয়টা দুঃখের হলেও আমার জন্য একটু আনন্দের, এই দুর্দিনে অমল দা'র পাশে দাঁড়াব আমি। তিনি আমাকে ফিরিয়ে দিবে না, এটা সিওর আমি। করোনাভাইরাসের মহামারী শুরু হওয়ায় দেশের অচলাবস্থা শুরু হয়ে গেছে। রাস্তা-ঘাট বন্ধ হয়ে গেছে। স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে গেছে। বাইরে কোনো লোকজন নেই। সবাই ঘরে বন্দি হয়ে পড়েছে। পত্রিকা পরিবহণ ও বিক্রির ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। কিন্তু পত্রিকা কিনবে কে? তবুও অমল দা এয়ারপোর্টের বিপরীতে পত্রিকা বেঁচা-বিক্রি করেন। পুলিশ-প্রশাসনের লোকজন পত্রিকা কেনেন। কিন্তু এটিও তিনি বেশি দিন করতে পারলেন না। বেশিরভাগ পত্রিকা অফিস বন্ধ হয়ে যায়। হাতে গোনা নামিদামি পত্রিকাগুলো বের হতে থাকে। তাও কম পাতায়। সাংবাদিকদের করোনাভাইরাস ধরায়, খবর সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন জায়গায় না যেতে পারায়, পরিবহণ সংকটে অফিস করতে না পারায় পত্রিকা অফিসগুলো বন্ধ হয়ে যায়। আমারো লেখালেখি বন্ধ হয়ে যায়। পত্রিকা বের হয় না, লেখাও ছাপা হয় না। লিখতে মনও টানে না। সবচে বড় কথা, মৃত্যুভয় তাড়া করে। যদি করোনাভাইরাসে মারা যাই, তবে এত লিখে কী হবে? দেশে এত লেখকের ভিড়ে আমার লেখা কি পাঠকের কাছে পৌঁছাবে? বেঁচে থাকতেই পাঠকদের কাছে পৌঁছাতে পারাটা মুশকিল। লেখকদের নানা সংগঠনের চিপায় পরে ভালো ভালো লেখকরা মূল্যায়নের সুযোগ পায় না আজকাল।

পত্রিকা যেহেতু বন্ধ, তাহলে অমল দা-র স্টলও বোধহয় বন্ধ, তাহলে অমল দা কীভাবে সংসার চালাচ্ছেন- এমন ভাবনা আমার মাথায় আসে বলেই আমি তাকে সহযোগিতা করার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিই। সকালের দিকে তাকে কল দিই। কল দিতেই ওপাশ থেকে অমল দা বলে ওঠেন, কেমন আছেন?

'জি ভালো আছি। আপনার কী অবস্থা, দাদা?'

'এই তো দোকানপাট বন্ধ। খালি ঘরে বইয়া থাহি। কাজকাম নাই।'

তাঁর কথার মধ্যে একটু দুশ্চিন্তার আভাস পেলাম। দুশ্চিন্তা হওয়ারই কথা এ সময়। যারা গরিব-অসহায়, তারা বড়লোকের দেয়া দান, সরকারের দেয়া ত্রাণ পাচ্ছে। যারা কর্ম করে খায়, তারা কারো কাছে যেতে পারছে না, চাইতে পারছে না। অমল দা'র চাওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই, তা আমি জানি। হয়ত তিনি বউ-বাচ্চাকে কদিন পর কী খাওয়াবেন, এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। এটা স্বাভাবিক। অমল দা'র সাথে কথা বলার পর আমার শরীররটা নাড়া দিয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে এটিএম কার্ড নিয়ে বুথে ছুটে গেলাম। পত্রিকায় লেখালেখি করে সম্মানী পাওয়া বাবদ তিন হাজার তিনশ তেত্রিশ টাকা জমা ছিল ব্যাংকে। ওখান থেকে তিন হাজার টাকা বের করে সুপার সপে গেলাম। দোকানপাট বন্ধ। শুধু এই নামিদামি দোকানগুলোই খোলা আছে। সেখান থেকে চাল, ডাল, তেল, মাছ, মশলা, সবজিসহ সংসারের যা লাগে ও তাঁর দুটো বাচ্চার জন্য বিস্কুট, চিপসসহ মোট আটাশশ বিশ টাকার বাজার করলাম। বাজারের ব্যাগ দেখে মনটা আমার ভরে গেল। সত্যি যে আমি কোনো দিন বাজারে যাই না, সংসারে কী কী লাগে জানি না, সে আমি এত কিছু করে ফেললাম।

রিকশা-ভ্যান কিছু নেই। মুখে মাস্ক, হাতে হ্যান্ডগ্ল্যাভস পরা আমি বাজার মাথায় নিয়ে অমল দা'র বাড়ির দিকে রওনা করলাম। তিনি যে বস্তিতে থাকেন, তা আমি চিনি। মাঝেমধ্যে দুপুরে তাকে খেতে যেতে দেখতাম, তখন আমিও ভার্সিটি থেকে ফিরতাম। প্রায় বিশ মিনিট হাঁটার পর অমল দা যে বস্তিতে থাকেন, সে বস্তিতে পৌঁছে গেলাম। একজনকে জিগ্যেস করতেই তিনি ইশারা দিয়ে অমল দা'র ঘরটা দেখিয়ে দিলেন। আমি মাথা থেকে বাজারের ব্যাগ নামিয়ে তাঁর দরজাটাতে টোকা দিলাম। অমল দা দরজাটা খুললেন। আমাকে এই অসময়ে দেখতে পেয়ে তিনি ভীষণ অবাক হলেন।

'এই করোনার মধ্যি আপনি এহেনে? আপনার তো জানে ভয়ডর নেই, দেখছি।'

'আরে না দাদা, এই দেখেন না, কত নিরাপত্তা নিয়ে এসেছি। করোনা ধরতে পারবে না।'

'তয় কী মনডা করে এই অসময়ে গরিবের বাড়ি? কোনো দিন আহেননি তো?'

'মনে কিছু করবেন না। আপনার জন্য কিছু জিনিসপত্র এনেছি। এগুলো রাখলে আমি বড় খুশি হতাম। জানেনই তো সময়টা ভালো যাচ্ছে না কারো।'

তাঁর দুটো সন্তান দৌড়ে এসে বিস্কুট, চিপসের প্যাকেট নিয়ে গেল। তাজা মাছটা লড়তে দেখে তাঁর বউ হাসি দিয়ে উঠলেন। অমল দা মন থেকে 'নিব না' বললেও আমার দিকে তাকিয়ে কেঁদে ফেলেন। বললেন, 'দাদা গো, আপনি আমার দুঃখডা বুঝতি পারছেন। কামাই নাই, রোজগার নাই, ক্যামনে যে দিন কাটছে তা বলতি পারি নে। টিসিবির পণ্য কিনতি যাইয়ে লম্বা লাইনে খাড়ায়েও কিচ্ছু মেলে না কপালে। খালি হাতে ফিরতি হয়। সোমত্ত মানুষকে কেউ ত্রাণ, দান দেয় না।'

অমল দা'র কান্না শুনে মন চাচ্ছিল, তাকে বুকে জড়িয়ে নিই। কিন্তু তা তো সম্ভব না। মানুষে মানুষে কমপক্ষে তিন ফুট দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। শুধু তাকে সান্ত্বনা দিলাম, 'দাদা, এই মহামারী বেশি দিন থাকবে না। আপনি আবার স্টল চালু করতে পারবেন, আমি আবার ভার্সিটিতে যেতে পারব। আপনার শরীরে আবার শহরের ধুলোবালি আপনাকে মিশকালো করে তুলবে। আমার লেখা 'দেখা শহরের অদেখা গল্প' পত্রিকায় ছাপা হবে। আপনি পত্রিকা রেখে দিবেন। আমার লেখা পড়বেন। আমি ফেরার পথে পত্রিকা নিয়ে বাড়ি ফিরব। আপনার সাথে আবারো দাঁড়িয়ে গল্প করব- এই শহরে আমরা কেন এসেছিলাম?
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আনার মতামত দিন।
মতামত দিতে চাইলে অনুগ্রহ করে করুন।
আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন।
সর্বাধিক পঠিত
ফটো গ্যালারি
আজকের পত্রিকা
আজকের নামাজের সময়সূচীঅক্টোবর - ২৩
ফজর৪:৪৩
যোহর১১:৪৩
আসর৩:৪৯
মাগরিব৫:২৯
এশা৬:৪২
সূর্যোদয় - ৫:৫৯সূর্যাস্ত - ০৫:২৪
পুরোন সংখ্যা
বছর : মাস :
আজকের পাঠকসংখ্যা
৬৯০৬.০
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতিঃ সৈয়দ এম. আলতাফ হোসাইন। সম্পাদক : আহ্সান উল্লাহ্। প্রকাশক ছৈয়দ আন্ওয়ার কর্তৃক রোমাক্স লিমিটেড, তেজগাঁও শিল্প এলাকা থেকে মুদ্রিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : খলিল ম্যানশন (৩য়, ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলা), ১৪৯/এ, ডিআইটি এক্সটেনশন এভিনিউ, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত। ফোন : ৯৩৫৭৭৩০ (বার্তা), ৮৩১৫৬৪৯ (বাণিজ্যিক), ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪.
ই-মেইলঃ djanata123@gmail.com, bishu.janata@gmail.com
ফোনঃ ০২৮৩১৫১১৫, ০২৮৩১৫৬৪৯ ফ্যাক্সঃ ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪
Copyright The Dainik Janata © 2010 Developed By : orangebd.com.