নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা, মঙ্গলবার ২৩ অক্টোবর ২০১২, ৮ কার্তিক ১৪১৯, ৬ জিলহজ ১৪৩৩
সাংবাদিকতা ও সাহিত্যে মুজীবুর রহমান খাঁ
মুহম্মদ আলতাফ হোসেন
স্বনামধন্য সাংবাদিক ও সাহিত্যিক মুজীবুর রহমান খাঁর ১০২তম জন্মবার্ষিকী আজ ২৩শে অক্টোবর । ১৯৮৪ সালের ৫ই অক্টোবর তিনি ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। তার জন্ম ১৯১০ সালের ২৩শে অক্টোবর নেত্রকোনা জোলায়। গুনে গুনে ৭৪ বছরের ১৮ দিন কম তিনি এই ধরাধামে পদচারণা করেছেন। এই পৌনে এক শতাব্দী তিনি সর্বদাই ছিলেন আপন প্রতিভা ও গুণাবলীতে দেদীপ্যমান। সংক্ষিপ্ত পরিসরে তার কর্মময় জীবনের বিভিন্ন দিক ও ব্যক্তিগত গুণাবলী তুলে ধরা সম্ভব নয়। পৃথিবীতে সত্যিকারের প্রতিভা যারা, সত্যিকার অর্থে গুণী যারা, তাদের স্মৃতিচারণ বা গুণাবলীর রোমন্থন করা বেশ কঠিন ব্যাপার। কারণ তাদের প্রতিভার ক্ষেত্র বা গুণাবলীর বিকাশ এত বেশি বিস্তৃত হয়ে থাকে যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে তা যথাযথ রূপে হৃদয়ঙ্গম করাটাই দুরূহ হয়ে দাঁড়ায়।

জ্ঞানীর কলমের কালী শহীদের রক্তের চেয়ে পবিত্র_ এই বাণী মহানবীর। অসির চেয়ে মসি অনেক বেশি শক্তিধর_ একথাও আমাদের সকলের জানা। আজ আমরা এমন এক নিবেদিত চিত্ত একনিষ্ঠ সাংবাদিক মনীষীর স্মৃতিচারণ করছি, যিনি তার মসির শক্তিতে বলীয়ান হয়ে অমরত্বের দুর্লভ সম্মান লাভ করতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর কর্মজীবন কলমের কালির দীপ্তিতে ভাস্কর। কোন ভয়, লোভ বা প্রলোভন তাকে তার সাধনা থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। প্রয়োজনে তিনি যে কতো বড় স্বার্থ ত্যাগ করতে পেরেছেন, তিনি ছাড়া তার কোন দ্বিতীয় নজির নেই। তৎকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স ডিগ্রী লাভ করেও তিনি সাহিত্য সাধনা ও সাংবাদিকতার মাধ্যমে দেশ ও জাতির সেবা করার পথ বেছে নেন। অথচ ইংরেজ সরকারের বড় আমলা হওয়া তার জন্য কষ্টসাধ্য ছিল না।

মুজীবুর রহমান খাঁর জন্ম যে সময় হয়েছিল, সেটি ছিল এই উপমহাদেশের মুসলিম সমাজের জন্য এক যুগসন্ধিক্ষণ। নিজেদের প্রাচুর্যময় অতীত ঐতিহ্যের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলা ছাড়া সে সময় মুসলমানদের যেন কিছুই করার ছিল না। তাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে তারা সঁপে নিয়েছিল ভবিতব্যের হাতে। যুগোপযোগী ঐতিহ্য সৃষ্টিতে তারা হয়ে পড়েছিল অক্ষম। চারদিক থেকে তাদের উপর নেমে এসেছিল দুযর্োগের ঘনঘটা। ঠিক এই সময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় মুসলিম সমাজকে চেতনার ধার মেরে পুনর্জাগরিত করতে যে ক'জন মহাপুরুষের আবির্ভাব এই উপমহাদেশে, বিশেষ করে বাঙালি মুসলিম সমাজে হয়েছিল মরহুম মুজীবুর রহমান খাঁ ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম।

বৃটিশ বেনিয়াদের পরাধীনতার নিগুঢ় পাশে আটক দেশ ও জাতির জন্য বলিষ্ঠ সাংবাদিকতা যেমন অপরিহার্য, তেমনি স্বাজাত্যবোধ ও জাতীয় চেতনা গড়ে তোলার কাজেও সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্রের বিকল্প নেই। সে সময় মুসলমান সাংবাদিকদের সংখ্যা হাতে গুনে বের করা যেত। প্রকৃত অর্থে গোনার অবকাশও ছিল না। এমনই মুষ্টিমেয় ক'জন ছিলেন তারা। মুসলমানদের সংবাদপত্রের সংখ্যা ছিল দু'একটি। সাংবাদিকতা তখন অনেকটা অবহেলিত। যারা অন্য কোন সুযোগ বা পেশার আশ্রয় লাভে ব্যর্থ হতেন বা অক্ষত ছিলেন মূলতঃ তাদের মধ্যেই সাংবাদিকতা সীমাবদ্ধ ছিল। অর্থানুকুল্য ছিল না, চাকরির অনিশ্চয়তা, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত জেনেও ইংরেজি সাহিত্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিয়ে এই পথে অগ্রণী হয়েছিলেন তিনি। এ কারণেই আমরা যে ক'জন সাংবাদিক নিয়ে গর্ব করতে পারি তিনি ছিলেন তাদের অন্যতম পুরোধা। তার সদালাপী, নিরহংকার, সুমধুর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে লেখনির সংস্পর্শ আমাদের সাংবাদিকতার অঙ্গনে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে চিরকাল। শুধু সাংবাদিক হিসেবেই নয়, একজন শক্তিশালী প্রাবন্ধিক রম্য লেখক, সাহিত্যসেবী অনন্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি নিজেকে সাংবাদিক পরিচিতির সঙ্গে সু-প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি নজরুল সাহিত্য, শরৎ সাহিত্য ও আধুনিক ইউরোপীয় সাহিত্য সম্পর্কে বহু মূল্যবান প্রবন্ধ লিখেছেন। দৈনিক আজাদ ও দৈনিক পয়গামসহ অন্যান্য সংবাদপত্র ও সাময়িকীতে প্রকাশিত রচনা গুচ্ছ তার বিশিষ্ট প্রতিভার স্বাক্ষর। তার প্রকাশিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে বিলেতে প্রথম ভারতবাসী, আমাদের ইতিহাস, পাকিস্তান, গাজী ও শহীদ উল্লেখযোগ্য।

সাংবাদিক সাহিত্যিক মুজীবুর রহমান খাঁ ছিলেন বিনয়ী, স্বভাব ছিল তার অতি মধুর, ব্যবহারে ছিল তার নম্রতা-ভদ্রতা। সবার উপরে বিশেষভাবে লক্ষণীয় ছিল তার বলিষ্ঠ চারিত্রিক গুণাবলী। অন্যায়ের সাথে কোন দিন কোন অবস্থাতেই আপসরফা করতে যাননি তিনি। বরং শান্ত অথচ তীব্র ভাষায় অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে চরম প্রতিকূল অবস্থায়ও তার বুক কাঁপেনি কখনো। বৃটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুথান, আমাদের মুক্তি সংগ্রাম, স্বাধীন বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনসহ দেশ ও জাতির কল্যাণে নিয়োজিত সব আন্দোলন সংগ্রামে তার বলিষ্ঠ কলম দিয়েছে দিক-নির্দেশনা। মরহুম মুজীবুর রহমান খাঁ ছাত্রজীবনে অত্যন্ত মেধাবী ও সুপরিচিত ছিলেন। ইচ্ছা করলেই তিনি সেকালের বৃটিশ সরকারের অধীনে উঁচু পদে চাকরি নিয়ে নির্ঝ্ঞ্ঝাটে জীবন-যাপন করতে পারতেন। কিন্তু স্বদেশ ও স্বজাতির দুর্দশা তাকে প্রচণ্ড ভাবে আন্দোলিত ও আলোড়িত করেছিল। মুসলিম সমাজের অবমাননাকর নিস্তেজ অবস্থা তাকে ব্যথিত করে তুলেছিল। তাই প্রলোভনের হাতছানিতে বিভ্রান্ত না হয়ে তিনি আত্মনিয়োগ করেন আধমরা জাতিকে চেতনার ঘা মেরে সচকিত করার কাজে। তার বলিষ্ঠ লেখনির পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে শুরু করেন তিনি। সে সময় মুসলিম সমাজের মুখপত্র হিসেবে যে ক'টি পত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হতো সেগুলোর প্রায় সবগুলোর সাথে তিনি কোন না কোনভাবে সম্পর্কিত ছিলেন। মুসলিম জাতির প্রতি আত্মসচেতনতার আহ্বান সম্বলিত তার বহু লেখা এসব পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। এসব লেখা সংগ্রহ ও মূল্যায়ন করা দেশ ও জাতির একান্ত কর্তব্য ছিল। কিন্তু আমরা সে দায়িত্ব পালন করতে পারিনি।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের আগে মুসলমানদের একমাত্র দৈনিক মুখপত্র হিসাবে মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ প্রকাশিত আজাদ পত্রিকার সে সময়কার ভূমিকা সর্বজনবিদিত। চলি্লশের দশকের গোড়ার দিকে আবুল কালাম শামসুদ্দিন এই শক্তিশালী পত্রিকাটি সম্পাদনার গুরু দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। মরহুম মুজীবুর রহমান খাঁও ১৯৩৬ সালের ৩১শে অক্টোবর আজাদ পত্রিকা প্রকাশনার সূচনা থেকেই সহকারী সম্পাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সে সময় আজাদ পত্রিকা এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের পানে অত্যন্ত সাফল্যের সাথে সগৌরবে এগিয়ে গেছে। মুসলিম সমাজের নবজাগরণ ও হৃত মনোবল পুনরুদ্ধারে এই পত্রিকার মাধ্যমে মুজীবুর রহমান খাঁ তার প্রতিভার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছেন। অচিরেই দৈনিক আজাদ হয়ে উঠেছিল মুসলিম সমাজের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, তাদের প্রিয় পত্রিকা। মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাস ভূমির পক্ষে সেকালের বাংলাভাষী মুসলমানদের সংগ্রামী অগ্রযাত্রায় দৈনিক আজাদ পত্রিকা ও মুজীবুর রহমান খাঁ'দের বলিষ্ঠ লেখনি কোন অবস্থাতেই উপেক্ষা করা যাবে না। এই সময় প্রকাশিত মুজীবুর রহমান খাঁর পাকিস্তান নামক গ্রন্থ মুসলমানদের পৃথক আবাসভূমির দাবিকে যৌক্তিক ভিত্তিতে দাঁড় করায়।

মরহুম মুজীবুর রহমান খাঁ নির্ভীক ও বলিষ্ঠ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে যে দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তা আমাদের দেশের সাংবাদিকদের জন্য অনুসরণীয় হয়ে থাকবে চিরকাল। তিনি প্রায় ৫০ বছর সংবাদপত্র নামক ফোর্থ এস্টেটে একটি ঈর্ষাযোগ্য আসনে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন আপন মহিমায়। তার মতো সাফল্য, বৈচিত্র্য ও তাৎপর্যম িত সাংবাদিক জীবন বিরল। জাতির সংকটকালে সঠিকপথের নির্দেশনা এবং নৈতিক অবক্ষয়ের মুহূর্তে মহৎ মূল্যবোধ জাগিয়ে তুলতে তিনি ছিলেন অনন্য।

আমাদের সাহিত্য জগতেও মুজীবুর রহমান খাঁ ছিলেন অত্যন্ত উজ্জ্বল এক জ্যোতিষ্ক। তার রচিত এবং অনুদিত সাহিত্য কর্মের সাথে যাদের পরিচয় আছে, তারাই জানেন তার লেখনি কতটা সৃষ্টিধর্মী চেতনায় ভরপুর। সাহিত্যের প্রতি তার অনুরাগ ছিল তুলনাহীন। কলকাতার দৈনিক আজাদ অফিসে মরহুম আবুল কালাম সামসুদ্দিনের উৎসাহ ও প্রেরণায় নিয়মিত বসতো সাহিত্য আসর। এই সাহিত্য সভায় যে সব বিশিষ্ট মুসলিম ব্যক্তিত্ব নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন তাদের মধ্যে আবুল মনসুর আহমদ ও মুজীবুর রহমান খাঁ ছিলেন অন্যতম। এসব সাহিত্য সভায় মুজীবুর রহমান খাঁর সাহিত্য প্রতিভা প্রত্যক্ষ করে সবাই চমৎকৃত হতেন। সাহিত্য সৃষ্টিতে তিনি যে বিরল প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন তা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণীয়। কেবল সাহিত্য নয়, সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন সমান উৎসাহী। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে স্বাজাত্যবোধের বিকাশ, স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়ে তোলা এবং মুসলিম চেতনা জাগ্রত করে এমন যে কোন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের তিনি ছিলেন একজন উৎসাহী পৃষ্ঠপোষক। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি বাংলা একাডেমী, নজরুল একাডেমী, জাতীয় সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদ ও আলাপন সাহিত্য গোষ্ঠীর সাথে জড়িত ছিলেন। আমার প্রতিষ্ঠিত আলাপন সাহিত্য গোষ্ঠী ও জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার তিনি ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা। ১৯৫৪ সালের ২০শে অক্টোবর ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তান প্রেসক্লাব গঠিত হলে তিনি এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তিনি প্রেসক্লাবের সভাপতি পদে বহাল থেকে এর মজবুত ভিত্তি গড়ে তোলেন। ১৮ তোপখানা রোডে জাতীয় প্রেসক্লাব পূর্ব পাকিস্তান প্রেসক্লাবেরই উত্তরসূরি।

মরহুম মুজীবুর খাঁ ছিলেন দেশের সাংবাদিকতা জগতের কিংবদন্তী। তার জীবন ও কর্মের মূল্যায়নে তার ইন্তেকালের পর বিগত দেড় যুগেও কোন পদক্ষেপ লক্ষ্য গোচর হয়নি। তার পরিবারের পক্ষ থেকেও তেমন কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। তার ১০২তম জন্মবার্ষিকীর দিনে তাই সকলের প্রতি আবেদন, জাতীয় পর্যায়ে মরহুম মুজীবুর রহমান খাঁর অবদান তুলে ধরার ক্ষেত্রে স্বীয় ভূমিকা পালনে সংশ্লিষ্ট সকলে এগিয়ে আসুন।

মুহম্মদ আলতাফ হোসেন : লেখক সাংবাদিক

এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আনার মতামত দিন।
মতামত দিতে চাইলে অনুগ্রহ করে করুন।
আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন।
সর্বাধিক পঠিত