নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা, রবিবার ১১ নভেম্বর ২০১২, ২৭ কার্তিক ১৪১৯, ২৫ জিলহজ ১৪৩৩
আহমদ ছফা
বুদ্ধিবৃত্তির দুঃসাহসী নায়ক
আবদুল্লাহ আল মোহন
আহমদ ছফা- সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় প্রতিভার সাক্ষর রেখেছেন যিনি অতি স্বচ্ছন্দে, সাবলীলভাবে। ছফা আমাদের দেশের তেমন একজন বিরলদৃষ্ট লেখক যাঁর প্রতিটি রচনাই তাঁর মৌলিক চিন্তাশক্তি ও সৃজনীপ্রতিভার পরিচয় বহন করে। ব্যক্তিক জীবনের অন্তঃস্থ সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম প্রবণাসমূহ, যেমন, আবেগ-উদ্দীপনা-সংবেদনা-বিষাদ এবং এ সবের সমান্তরালবর্তী সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের নানান অঘটন ও ঘটনাকে উপজীব্য করে দীর্ঘদিনব্যাপী ব্যতিক্রমী ধারার চিন্তা চচ্র্চা ও গ্রন্থ রচনা করে সর্বমহলে তিনি যেমন প্রশংসিত হয়েছেন, তেমনি হয়েছেন সমালোচিত। জীবনের মোহের কাছে তিনি পরাজিত হননি। আহমদ ছফার জীবন ও রচনা পাঠের মাধ্যমে বুঝতে কষ্ট হয় না যে, সমকাল ছফাকে চিনতে পারেনি, ধারণ করতে পারেনি। ষাটের দশকের মধ্যবর্তী পর্যায়ে বাংলা সাহিত্যে তাঁর আবির্ভাব এক উল্লেখযোগ্য ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। দেশ ও জাতির কাছে দায়বদ্ধ থেকে প্রায় চলি্লশ বছর ধরে তিনি রচনা করেছেন গল্প, উপন্যাস, কবিতা, গান, প্রবন্ধ, অনুবাদ, ইতিহাস, ভ্রমণকাহিনী মিলিয়ে তিরিশটিরও অধিক গ্রন্থ। শিল্প সাহিত্যের সকল শাখায় স্বচ্ছন্দ বিচরণ সত্ত্বেও কথা সাহিত্যে বিশেষত উপন্যাস রচনায় তাঁর সাফল্য প্রশ্নাতীত। বলা হয়ে থাকে মননে-মেধায় শিল্পিত স্বভাবে আহমদ ছফার উপন্যাসসমূহ স্বকীয়তাম-িত। আহমদ ছফা তাঁর স্বকাল ও স্বসমাজকে উপন্যাসের বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেছেন। প্রত্যয়দীপ্ত অভিব্যক্তিতে তিনি বাঙালির আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা, শোষণ, সংগ্রাম ও রাজনীতির বহিঃস্রোতকে ব্যক্তির অন্তর্জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত করে উপন্যাসে উপস্থাপন করেছেন

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অনিবার্য ব্যক্তিত্ব ড. আহমদ শরীফ ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে আহমদ ছফা সম্পর্কে বলেছিলেন, 'দেশের জ্ঞানী-গুণী মানুষ যখন বিলাপে, স্মৃতিচারণে, কৃতিত্বের রোমন্থনে কিংবা চাটুকারিতায় নিরত, অথবা প্রাণভয়ে বিব্রত, তখন আহমদ ছফা বুদ্ধিবৃত্তির নতুন চিন্তায় নিষ্ঠ। সুবিধাবাদীর 'লাইফ ইজ এ কম্প্রোমাইজ' তত্ত্বে ছফার আস্থা নেই। আহমদ ছফা বয়সে কাঁচা, মনে পাকা, সঙ্কল্পে অটল।' নতুন দেশের তরুণ লেখক ছফা সম্পর্কে প্রাজ্ঞ আহমদ শরীফের এমন সার্টিফিকেট পাওয়ার পর আরও প্রায় ২৯ বছর বিরামহীন লিখে লিখে ২০০১ সালের ২৮ জুলাই মাত্র ৫৮ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন। আহমদ ছফার স্মরণসভায় জীবন্ত কিংবদন্তি সরদার ফজলুল করিম বলেছিলেন, 'ছফা কেবল পাঠ করার বিষয় নয়, চর্চা করার বিষয়।' তরুণ সমাজকে তিনি আহমদ ছফা চর্চা করার আহ্বানও জানিয়েছেন একাধিকবার। আপাদমস্তক সাহিত্যিক ও দার্শনিক আহমদ ছফার খুবই ঘনিষ্ঠ জনপ্রিয় লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল গত কয়েকবছরে তাঁর একাধিক লেখায় আফসোস ও বিলাপের সুরে ছফা সম্পর্কে বলেছেন, 'বড় অসময়ে চলে গেছেন তিনি। আরও অনেক বছর আহমদ ছফার বেঁচে থাকার দরকার ছিল আমাদের জন্যই।' আহমদ ছফা একই সঙ্গে মননশীল ও সৃজনশীল লেখক হিসেবে পাঠকের কাছে নন্দিত। তাঁর প্রতিটি গল্প, উপন্যাস রচিত হয়েছে আপন অভিজ্ঞতা, নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও কল্পনার মিশেলে। আহমদ ছফার উপন্যাসে প্রতিফলিত সমাজ ও রাজনীতির স্বরুপ সন্ধানে সচেষ্ট ছিলেন। এবার কয়েকটি উপন্যাসের দিকে চোখ ফেরানো যাক। কথাশিল্পী হিসেবে আহমদ ছফার যাত্রা শুরু 'সূর্য তুমি সাথী' উপন্যাসের মাধ্যমে। একুশ বছর বয়সের এই রচনায় ছফা নিজের পরিবারের সংলগ্ন কাহিনীকে তুলে ধরেছেন। প্রেক্ষাপট হিসেবে যে পরিচিত গ্রামকে তিনি ব্যবহার করেছেন তা যেন সারা বাংলাদেশের প্রতীকে পরিণত হয়ে ওঠে। হিন্দু-মুসলমান অধ্যুষিত গ্রামের সাম্প্রদায়িকতা, গ্রামীণ মধ্যবিত্ত ও মাতব্বর শ্রেণির অন্যায় দাপটে সাধারণ মানুষের করুণ জীবনের আলেখ্য নির্মাণ করেছেন। উপন্যাসে ছফা গ্রামীণ জীবনের পটভূমিতে দেশভাগ পরবর্তী সময়ে বাংলার আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটকে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে প্রকাশ করতে সফল হয়েছেন। আহমদ ছফার দ্বিতীয় উপন্যাস 'ওঙ্কার'। উনসত্তরের গণ-আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত এ উপন্যাসে একটি পরিবারকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের তৎকালীন অস্থির রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থাকে ধারণ করেছেন লেখক। তাঁর নিজের ভাষায়, 'একটা লেখা ক্লাসিক হিসেবে চিহ্নিত হবে বলে আমি মনে করি। তা হলো ওঙ্কার।' ছফা মোটেই বাড়িয়ে বলেননি। উপন্যাসে শহুরে জীবনের পটভূমিতে গণআন্দোলনের চিত্র উপস্থাপিত। 'ওঙ্কার'এ সচেতন দেশপ্রেমী মানুষের স্বদেশ চেতনার সমান্তরালে বোবা বউয়ের 'বাঙলা' উচ্চারণের মাধ্যমে প্রবল দেশপ্রেম প্রকাশের পাশাপাশি পাকিস্তানি শাসন ও শাসকের প্রতি তীব্র ঘৃণা প্রদর্শিত হয়েছে। নায়কের বোবা স্ত্রীর কথা বলার তথা আত্মপ্রকাশের আকুতিতে সমগ্র বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ ও বাকশক্তি অর্জনের আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন ঘটেছে।

আহমদ ছফার প্রেম ও যুদ্ধের উপন্যাস হিসেবে আলোচিত হয়ে থাকে 'অলতাচক্র'। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা এই উপন্যাসে তিনি যেসব কলাকুশলী বেছে নিয়েছেন, তাঁদের অধিকাংশ আমাদের চেনা মুখ; রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মানুষ। উপন্যাসের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে আমরা প্রত্যক্ষ করি, বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের গতি-প্রকৃতি, তার নানা পর্যায়, সবলতা ও দুর্বলতাগুলো। প্রত্যক্ষ করি লাখ লাখ নিরাশ্রয় মানুষের আকুতি, বেদনা ও স্বজন হারানোর শোক। সেই সঙ্গে ব্যক্তি মানুষের ক্ষুদ্রতা, স্বার্থবাদিতা এবং দ্বন্দ্বের বিষয়টিও লেখক শৈল্পিকভাবে তুলে ধরেছেন নানা ঘটনা ও চরিত্রের মধ্য দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধ সেদিন দেশের স্বাধীনতাকামী মানুষকে এক জায়গায় নিয়ে এলেও একতাবদ্ধ করতে পারেনি। আজকের বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক বৈরী অবস্থা ও বিদ্বেষ, তার বীজও রোপিত হয়েছিল একাত্তরে। মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যেও ছিল নানা মত ও পথ। রাজনীতির এই জটিল ও কুটিল দিকগুলোও লেখকের কুশলী বর্ণনায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ঘটনা পরম্পরায় এসেছে একাত্তরের নানা কলাকুশলী কেউ নায়ক, কেউ খলনায়ক। মানুষের জীবন এমনই বিস্ময়কর যে একই ব্যক্তি কোথাও নায়ক, কোথাও খলনায়ক। আহমদ ছফা এই উপন্যাসের মাধ্যমে একাত্তরে বাংলাদেশের রাজনীতির চালচ্চিত্র অঙ্কন করতে চেয়েছেন। অলাতচক্র যুদ্ধেরই উপন্যাস, একই সঙ্গে প্রেমেরও। কারণ প্রেম আর যুদ্ধ তো জীবনেরই অংশ।

সাহিত্য-সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতির মেলবন্ধন উপন্যাসিক আহমদ ছফার প্রকৃত অন্বিষ্ট। সাহিত্যকে তিনি কার্যকারণবিহীন স্বয়ম্ভূ কোনো কর্ম বলে মনে করতেন না বলেই আহমদ ছফার 'একজন আলী কেনানের উত্থান পতন' 'গাভী বৃত্তান্ত' 'অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী' 'মরণবিলাস'সহ অন্যান্য উপন্যাসও হয়ে ওঠে বাংলাদেশের দর্পণ।

আহমদ ছফা তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করেছেন প্রবাদতুল্য পুরুষ চলমান বিশ্বকোষ বলে পরিচিত জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাককে নিয়ে। লিখেছেন 'যদ্যপি আমার গুরু'। দীর্ঘদিন মেলামেশার করার ফলে অধ্যাপক রাজ্জাককে খুব ঘনিষ্ঠভাবে দেখার যে দুর্লভ সুযোগ আহমদ ছফার হয়েছিল তারই এক সামাজিক দলিল 'যদ্যপি আমার গুরু'। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের ব্যক্তিত্বের মহিমার উত্তাপ প্রকাশ পেয়েছে ছফার খোলামেলা, সরস, তীক্ষ্ম, গভীর লেখনীতে। অধ্যাপক মনসুর মুসা বলেছেন-'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের স্বনামখ্যাত অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক এক বিশিষ্ট বাকভঙ্গির অধিকারী ছিলেন। তিনি ঢাকা অঞ্চলের ক্রিয়াপদের সংগঠন যথাযথ ব্যবহার করে বাংলা ভাষার একটি মান্যরূপ নিজ প্রয়োজনে, নিজ কণ্ঠে, ঘরে-বাইরে সর্বত্র ব্যবহার করতেন। আহমদ ছফা সেই রীতিকে অমর করে রেখেছেন তাঁর 'যদ্যপি আমার গুরু' বইতে। এই প্রয়োগের প্রসঙ্গ আছে মুনীর চৌধুরীর ক্ষুদ্র অথচ অসাধারণ 'মাতৃভাষা' নামক প্রবন্ধে।'আহমদ ছফা প্রতিভার খোঁজ রাখতেন। তিনি প্রতিভাকে লালন করতেন। কবি হিসেবে লেখালেখি শুরু করলেও তিনি পরিচিতি পেয়েছেন প্রাবন্ধিক হিসেবে। তিনি দেশকে নিয়ে ভাবতেন। স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে দেশের অনিয়ম তাঁকে পীড়া দিত। সমাজ-ভাষা বিজ্ঞানী অধ্যাপক মনসুর মুসা ছফার চরিত্রের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে বলেছেন- 'আহমদ ছফা আমার সহযাত্রী। ছিলেন বন্ধু। বিপদে বন্ধুর পরীক্ষা হয়- এ প্রবাদ আমরা জানি। আমার জীবন যখনই বিপদাপন্ন হয়েছে, তখনই তিনি পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। কারণ, বোধ হয়, আমার ভিতরের মানুষটিকে তিনি কিছুটা জানার চেষ্টা করেছিলেন।' বাংলাদেশে সাধারণত দেখা যায়- যারা নতুন লেখালেখি শুরু করেন তাদের বই প্রকাশ করতে অনেক কষ্ট করতে হয়। সদ্য প্রয়াত জনপ্রিয় কথার জাদুকর হুমায়ূন আহমেদ প্রথম উপন্যাস লিখেছিলেন তখন সেটি প্রকাশ করতে কি ধরনের প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল? এমন প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন: 'খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার যে, আমাকে তেমন কোন প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়নি। আমার প্রথম উপন্যাসের নাম 'নন্দিত নরকে'। এটি প্রকাশ করতে খুব একটা সমস্যা হয়েছে বলে আমি মনে করি না। কারণ, আহমেদ ছফা ছিলেন আমাদের দেশের খুবই স্পিরিটেড একজন মানুষ। আমার ওই উপন্যাসটি একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। যে কোন কারণেই হোক উপন্যাসটি তার মনে ধরে গিয়েছিল। তিনি জান দিয়ে ফেললেন এটি প্রকাশ করার জন্য। এই উপন্যাসের পা-ুলিপি নিয়ে তিনি প্রতিটি প্রকাশকের ঘরে ঘরে গেলেন। কিন্তু তখনও আমি ব্যাপারটা জানিই না। শুধু ছফা ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়। ছফা ভাই আজকে অমুকের কাছে গিয়েছি। কালকে অমুকের কাছে গিয়েছি- এভাবে বলে বলে তিনি একজন প্রকাশককে মোটামুটি কনভিন্স করে ফেললেন যে, উপন্যাসটি প্রকাশ করতে হবে। কাজেই উপন্যাস প্রকাশিত হয়ে গেল। তো উপন্যাস প্রকাশিত হওয়ার আগে কিন্তু ওই প্রকাশকের সঙ্গে আমার পরিচয়ও হয়নি। এরকমই ছিলেন আহমেদ ছফা।' আবার বরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানকে ব্যাপকভাবে পরিচিত করে তুলতে আহমদ ছফার ভূমিকাও বিশেষভাবে উল্লেখ না করলে চলে না

দৈনিক ইত্তেফাকের সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ও কবি নাজীমউদ্দিন মোস্তানকে সঙ্গে নিয়ে আশির দশকের শেষে আহমদ ছফা বস্তির দরিদ্র শিশুদের জন্য শিল্পী সুলতান কর্মশালা প্রতিষ্ঠা করেন। ছিন্নমূল শিশুদের স্কুল ছিল এটি, শিক্ষক ছিলেন দুজন- ছফা আর মোস্তান। পরে অনেকে যোগ দিয়েছিলেন এ উদ্যোগটির সঙ্গে। বিশ্ববিখ্যাত চিত্রশিল্পী সুলতানের নামে নাম দিয়েছিলেন 'শিল্পী সুলতান পাঠশালা'। কাঁটাবন বস্তি থেকে শুরু করে শাহবাগের আজিজ মার্কেট ঘুরে, বাংলামোটর (বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পাশে) স্কুলটি তাঁর জীবদ্দশায় ভালোই চলছিল। তখন ছফার অনেক বন্ধু-শুভাকাঙ্ক্ষী সুলতানের নামের সঙ্গে ছফার নামটি জুড়ে দেয়ার প্রস্তাব করেছিলেন। প্রতিবারই স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে ক্ষেপে গিয়ে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, 'সুলতান ভাই বিশ্ববিখ্যাত একজন শিল্পী তাঁর নামের সঙ্গে নগণ্য ছফার নাম যোগ করলে এ মহান শিল্পীর অবমাননা হবে।' তবে ছফার পরলোকগমনের পর তাঁর কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু যেমন, জাতীয় পতাকার শিল্পী শিবনারায়ণ দাশ, গাড়ি ব্যবসায়ী আবদুল হক, অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমানসহ কয়েকজন মিলে স্কুলটির নতুন নাম দেন 'সুলতান-ছফা পাঠশালা'। বাংলামোটর থেকে স্থানান্তরিত হয়ে কাঁঠালবাগান ঢালে (বর্তমানে সময় টেলিভিশনের ঠিক পেছনে) চলে আসে। গরিব স্কুল কর্তৃপক্ষকে ধনাঢ্য বাড়িওয়ালা ভাড়াটে হিসেবে দেখতে চান না বলে স্কুলটি আবার বাংলামোটরে টাইলসের মার্কেটের মধ্যে সরিয়ে আনতে বাধ্য হন তারা। টাকার অভাবে এই স্কুলটি বন্ধ হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে প্রশ্ন জাগা অস্বাভাবিক নয়- এদেশে টাকাওয়ালা মানুষের কি খুব অভাব?

জীবিত ও প্রয়াত আহমদ ছফা সম্পর্কে অপরিবর্তিত শ্রদ্ধাবোধ, ইমোশন ও অখ- দরদি মনোভাবাপন্ন মহান মানুষ এদেশে অনেকে হয়তো আছেন। আবার ছফার জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকীর আলোচনা সভায় বিকৃত ও খ-িত এক আহমদ ছফাকে উপস্থাপন করতে দেখে মর্মাহত হতে হয়। ১৯৭২ সালে ড. আহমদ শরীফ উপাধিত 'নন কমেপ্রামাইজিং' ছফা আজীবন আপসহীনই ছিলেন। সরদার ফজলুল করিমের আহ্বান 'আহমদ ছফা চর্চা'র। কিন্তু এসব অভিধা-উপাধির বিপরীতমুখী এক ছফাকে উপস্থাপন করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। অনেকেই মধ্যযুগীয় ও দুর্বোধ্য বাংলা লিখে আহমদ ছফাকে মহাত্মা জাতীয় নানাবিধ বিশেষণে ভূষিত করেন, একজন 'মৌলবি' হিসেবে দাঁড় করানোর নিরন্তর চেষ্টা করেন। আবার অনেকে তাঁকে প্রতিবেশী একটি রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে ছফাকে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন। অথচ আমরা জানি, আহমদ ছফা ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভারত গিয়েছেন, ট্রেনিং নিয়েছেন, সেখানকার পত্রিকায় কলাম লিখে মুক্তিবাহিনীর পক্ষে জনমত তৈরিতে ভূমিকা রেখেছেন। ভারতে বসেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ওপর প্রথম বই, উপন্যাস 'জাগ্রত বাংলাদেশ' লিখেছিলেন। পরবর্তী কালে অনেক লেখায়-আলোচনায় আহমদ ছফা ভারতবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।

আহমদ ছফা চর্চা ও তাঁকে আবিষ্কার করতে প্রয়োজন সেইসব তরুণ গবেষক-লেখকদের, যারা সৎসাহসী। ছফা অনেক প্রবন্ধে-নিবন্ধে বহুবার বলেছেন, আমাদের অপেক্ষা করতে হবে সেই সৎসাহসী তরুণদের জন্য যারা দশ, বিশ এমনকি পঞ্চাশ বছর পরে হলেও আমাদের লেখা নিয়ে গবেষণা করবেন। আহমদ ছফার ভাষায় 'সৎ সাহসকে অনেকে জ্যাঠামি ও হঠকারিতা বলে মনে করে থাকেন। তবে আমার মতে, সৎসাহস হলো অনেক দূরবর্তী সম্ভাবনাকে দেখতে পারার ক্ষমতা।' অনেকেই আক্ষেপ করে বলেন, জীবনানন্দকে আবিষ্কার করতে বহুদিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল বাঙালির। ছফাকে আবিষ্কার করতে আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে? এ কথা সবচেয়ে বেশি মনে আসে ফি-বছর জুন-জুলাই মাসে। আহমদ ছফার জন্ম ১৯৪৩ সালের ৩০ জুন চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ উপজেলার গাছবাড়িয়া গ্রামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম.এ পাস করেন। বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিকতা, গবেষণা, পত্রিকা পরিচালনা, এনজিও সংগঠন ইত্যাদি করলেও আজীবন লেখালেখিই ছিল তাঁর মূল পেশা। অকৃতদার এই চির তরুণ বাংলাদেশ লেখক-শিবিরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।

আহমদ ছফা ২০০২ সালে সাহিত্যের জন্য লাভ করেন মরণোত্তর একুশে পদক। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি রচনা: উপন্যাস- সূর্য তুমি সাথী, একজন আলী কেনানের উত্থান পতন, অলাতচক্র, ওঙ্কার, গাভী বৃত্তান্ত, অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী, ছোট গল্প সংকলান- নিহত নক্ষত্র, কবিতা সংগ্রহ- জল্লাদ সময়, লেনিন ঘুমাবে এবার, প্রবন্ধ- বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস, বাঙালি মুসলমানের মন, আমার কথা ও অন্যান্য প্রবন্ধ, কাব্যানুবাদ- জার্মান মহাকবি গেট্যের 'ফাউস্ট'। সম্পাদিত পত্রিকা- স্বদেশ, সাপ্তাহিক উত্তরণ ও উত্থানপর্ব। আহমদ ছফার ভাতিজা নুরুল আনোয়ারের চেষ্টায় ছফার সব লেখা নিয়ে একটা রচনাবলী বেরিয়েছে। মোরশেদ শফিউল হাসান ও সোহরাব হাসানের সম্পাদনায় বেরিয়েছে আহমদ ছফা স্মারকগ্রন্থও। আহমদ ছফার আত্মজৈবনিক উপন্যাস 'পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গপুরাণ' বাংলার গ-ি পেরিয়ে জাপানি ভাষায়ও অনুবাদ হয়েছে। মহাকবি গ্যেটের 'ফাউস্ট' বাংলা অনুবাদ করে দু' বাংলার বাঙালির কাছে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ানো ছাড়াও জামার্নিতে ফাউস্টের পানশালার কাছের একটা রাস্তার নাম ছফার নামে নামকরণ হয়েছে।
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আনার মতামত দিন।
মতামত দিতে চাইলে অনুগ্রহ করে করুন।
আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন।
সর্বাধিক পঠিত