নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা, বৃহস্পতিবার ১৫ নভেম্বর ২০১২, ১ অগ্রহায়ণ ১৪১৯, ২৯ জিলহজ ১৪৩৩
ভয়েস অব আমেরিকা খ্যাত সাংবাদিক
গিয়াস কামাল চৌধুরীর সুস্থতা কামনা
আহমদ সেলিম রেজা
ভ য়েস অব আমেরিকা খ্যাত প্রথিতযশা সাংবাদিক গিয়াস কামাল চৌধুরী এখন আর খুব একটা কথা বলতে পারেন না। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় ভয়েস অব আমেরিকায় যার দরাজ কণ্ঠের সংবাদ শুনতে ভিড় করত মানুষ, সেই অতিচেনা গিয়াস কামাল চৌধুরী এখন শয্যাশায়ী। অধিকাংশ সময় কাটে ঘরে শুয়ে বসে। স্মৃতিশক্তিও আগের মতো নেই আর। সহসা কাউকে দেখলে চিনতে পারেন না। তবে ঘনিষ্ঠজনদের চিনতে পারেন। কিন্তু কে তা ভেবে স্মরণ করতে হয়। শ্রবণশক্তিও প্রতারণা করেছে তার সঙ্গে। বার বার একটি কথা বললে তিনি তা হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন। কিন্তু তারপর আবার খেই হারিয়ে ফেলেন। এক বিষয়ে বলতে বলতে আরেক বিষয়ে চলে যান। সব কথা বোঝাও যায় না ঠিকমতো। এক সময়ের তুখোড় সাংবাদিক, জাতীয় প্রেসক্লাব ও সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতৃত্বদানকারী অবিসংবাদিত এই সাংবাদিক নেতা আজ দুরারোগ্য পারকিনসন রোগে আক্রান্ত। লড়াই করছেন জীবনের সঙ্গে।

জাতীয় প্রেসক্লাবে তার প্রবীণ সহযোদ্ধারা জানান, বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী যে কোনো কর্মকা-ের বিরুদ্ধে গিয়াস কামাল চৌধুরী ছিলেন সব সময় সোচ্চার। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণে তিনি পালন করেছেন অসাধারণ ভূমিকা। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় 'গিয়াস কামাল চৌধুরী, ভয়েস অব আমেরিকা, ঢাকা'র রিপোর্টের জন্য কান পেতে রাখেননি এমন মানুষ ছিল বিরল। সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সংবাদ বিশ্লেষক হিসেবে তিনি ছিলেন খ্যাতির শীর্ষে। পারিবারিকভাবে জানা যায়, ১৯৯৪ সালে গিয়াস কামাল চৌধুরী যখন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা বাসসের বার্তা সম্পাদক তখন তিনি ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তৎক্ষণাৎ তাকে সিএমএইচে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তার সফল অপারেশন হয়। তিনি জীবনের প্রথম বিপর্যয়টা কাটিয়ে ওঠেন। সিঙ্গাপুরে নিউরোলজির ট্রিটমেন্টের পর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছিলেন। এমনকি নিজ পেশায়ও ফিরে এসেছিলেন তিনি। এ সময় তার ধারাবাহিক চিকিৎসাসেবার প্রয়োজন দেখা দিলে তৎকালীন সরকার সাংবাদিকতায় তার অবদান বিবেচনা করে ১৯৯৫ সালে উন্নত ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার জন্য তাকে 'ইকোনমিক মিনিস্টার' পদে নিয়োগ দিয়ে লন্ডন পাঠিয়ে দেয়। ১৯৯৬ সালে চাকরির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তিনি সুস্থভাবে দেশে ফিরে আসেন। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় ওই সময় তাকে আর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় যোগ দিতে দেয়া হয়নি। এ সময় তিনি দৈনিক খবরপত্রের সম্পাদক পদে যোগ দেন। সাংবাদিক সমাজও তাকে আবার বরণ করে নেয় নিজেদের পেশার অধিকার আদায়ের নেতা হিসেবে। ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর তিনি আবার ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সভাপতি হিসেবে সাংবাদিক সমাজকে নেতৃত্ব দেন।

ছাত্রজীবনেও গিয়াস কামাল চৌধুরী ছিলেন একজন ডাকসাইটে নেতা। তিনি ছাত্র ইউনিয়ন করতেন। '৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন এবং '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানেও সক্রিয় ছিলেন রাজপথে। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর অনুসারী হিসেবে তিনি পাকিস্তান আমলে গণতান্ত্রিক ও স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনে অংশ নেয়ার অপরাধে বহুবার কারাবরণ করেন। এমনকি রাজনৈতিক কারণে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও সাময়িকভাবে বহিষ্কৃত হতে হয়েছিল। কিন্তু নীতির সঙ্গে কখনো আপস করেননি। সাংবাদিক হিসেবেও ছিলেন আপসহীন। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামসহ জাতীয় গণতান্ত্রিক ও পেশাজীবীদের অধিকার আদায়ে প্রতিটি আন্দোলনে পালন করেছেন অগ্রণী ভূমিকা।

গিয়াস কামাল চৌধুরী সাংবাদিকতা শুরু করেছিলেন ইত্তেফাক গ্রুপ থেকে প্রকাশিত 'ঢাকা টাইমস' পত্রিকার মাধ্যমে, ১৯৬৪ সালে। পরবর্তীতে মর্নিং নিউজের ল করেসপনডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর তিনি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় যোগদান করেন। কার্যত এখান থেকেই তার সাংবাদিকতার বিকাশ। এরপর সাংবাদিক নেতা হিসেবেও আবির্ভূত হন। ১৯৭৯ সাল থেকে টানা চার বছর তিনি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি এবং দুই টার্ম বাদ দিয়ে ১৯৮৩ থেকে '৯০ সাল পর্যন্ত টানা ছয় বছর জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। গিয়াস কামাল চৌধুরী ১৯৩৯ সালে চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সনদ অনুযায়ী সেটা ছিল ২১ জুলাই। তার স্থায়ী নিবাস ফেনী সদর উপজেলার শর্শদি চৌধুরীবাড়িতে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এ, এলএলবি ও জার্নালিজমে ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করেন। সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্য রাষ্ট্রীয় একুশে পদকে ভূষিত হয়েছিলেন।

ব্যক্তিগত জীবনে গিয়াস কামাল চৌধুরী দুই মেয়ে ও এক ছেলের জনক। ছেলে রফিক-উম-মুনির চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক। তার স্ত্রী অধ্যাপিকা নওশেরা বেগমও পেশায় ছিলেন একজন শিক্ষক। গিয়াস কামাল চৌধুরীর ছেলে পিতার রোগমুক্তির জন্য সবার দোয়া চেয়েছেন।

আহমদ সেলিম রেজা : লেখক

এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আনার মতামত দিন।
মতামত দিতে চাইলে অনুগ্রহ করে করুন।
আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন।
সর্বাধিক পঠিত