নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা, বুধবার ১৫ নভেম্বর ২০১৭, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৫ সফর ১৪৩৯
বঙ্গবন্ধুর ভাষণ : ইউনেস্কোর স্বীকৃতি
মো. সহিদুল ইসলাম
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের জগৎ বিখ্যাত ভাষণ আন্তর্জাতিক মর্যাদা লাভ করেছে। আরো একবার বিশ্ব সভায় মাথা উঁচু করে দাঁড়ালো বাংলাদেশ। সমসাময়িক পৃথীবির রাজনৈতিক ইতিহাসে বাঙালি জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঔতিহাসিক ভাষণ সবচেয়ে গুরুক্তপূর্ণ ও বৈশিষ্টমন্ডিত। এই ভাষণের মধ্য দিয়ে একটি দেশ ও জাতির রুপরেখা তৈরি হয়েছিল। এক প্রতিকূল পরিবেশে ১০ লক্ষ জনতার সামনে তিনি সেই ভাষণ প্রদান করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন প্রতিদিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে সে ভাষণের অংশ বিশেষ প্রচার করা হত। এই ভাষণ বুকে ধারণ করে লাখো মুক্তিযোদ্ধা আত্মোৎসর্গ করে এই দেশকে স্বাধীন করেছেন। এই ভাষণের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য ব্যাপক বিশ্লেষণ ও গবেষণার দাবি রাখে, দাবি রাখে ব্যপক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির। ইতোমধ্যে ভাষণটি বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে ইউনেস্কোর মেমোরী অব দ্যা ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিষ্টারে যুক্ত হয়েছে। গত ৩০ অক্টোবর প্যারিসে ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে সংস্থাটির মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা এক ঘোষণায় একথা জানিয়েছেন। এই তালিকার মাধ্যমে ইউনিস্কো বিশ্বের গুরুক্তপূর্ণ ঘটনা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে। বিশ্ব ঐতিহ্য ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার আন্তর্জাতিক তালিকাই মূলত মেমোরী অব দ্যা ওয়ার্ল্ড। এর মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন অংশের ঘটনার সংরক্ষণ ও সবার কাছে পৌছানোর চেষ্টা করছে ইউনিস্কো।

বঙ্গবন্ধু যে বাঙালি জাতির মুক্তির কান্ডারী, মহানায়ক ও মহান নেতা হবেন একথা কৈশোরেই জানান দিয়েছিলেন খোকা তার বিভিন্ন কর্মকান্ডে। এখানে একটি ঘটনা না বললেই নয়, ১০ আগষ্ট ১৯৯৮, ১৫ আগষ্ট জাতীয় শোক দিবসকে সামনে রেখে সরেজমিন বিচার করার নিমিত্তে প্রেস ইনিস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআইবি) এর আয়োজনে আমরা ১০ জন সাংবাদিক যাই গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়। আমাদের সাথে ছিলেন পিআইবি'র ফি'চার ডিরেক্টর প্রয়াত সায্যাদ কাদির ও চিফ ফটোগ্রাফার আওলাদ হোসেন। আমরা কথা বলেছি টুঙ্গিপাড়ার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সাথে। তারা কথা বলেছেন প্রাণ খুলে। বলেছেন বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাদের অগাধ ভক্তি, শ্রদ্ধা আর ভালবাসার কথা। কথা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর চাচা প্রয়াত শেখ আশরাফুল হকের সাথে (তখন তাঁর বয়স ছিল ৯৩ বছর)। তিনি বলেছেন, বঙ্গবন্ধু আমার তিন দিক থেকে আত্মীয়। চাচাত ভাইয়ের ছেলে, চাচাত বোনের ছেলে আবার ভাগিনী জামাই। তিনি একাধারে বঙ্গবন্ধুর খেলার সাথী এবং সহপাঠীও বটে। যে গর্বের কাহিনী একদা বঙ্গবন্ধুর সহপাঠীদের মুখে মুখে ছিল, শেখ আশরাফুল হক তা গল্পের মতই শুনালেন:-

বঙ্গবদ্ধু তখন গোপালগঞ্জ মিশনারী স্কুলের ছাত্র। ১৯৩৮ সালের ১৬ জানুয়ারি। শীতের এক দুপুরে গোপালগঞ্জে এলেন অভিবক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা ফজলুল হক। তার সাথে এলেন পল্লী ও বাণিজ্য উন্নয়ন মন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তারা শহরের মিশনারী স্কুল পরিদর্শন করবেন। ফুল ও লতা-পাতায় সাজানো ছিল স্কুলের প্রধান ফটক।

প্রধানমন্ত্রী স্কুল পরিদর্শন করলেন। স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা ভীষণ খুশি। তারা প্রধানমন্ত্রীকে স্ব-চক্ষে দেখেছে। কিন্তু ক'জন ছাত্র অখুশি। তারা ছাত্রাবাসে থাকে। ছাত্রাবাসের উপরের চাল মজবুত নয়। বর্ষাকালে পানি পড়ে। কথা ছিল বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হবে। তিনি টাকা দেবেন। কিন্তু কেউ সাহস করে সে কথা বলতে পারে নি।

প্রধানমন্ত্রী স্কুল পরিদর্শন করে ডাক বাংলায় ফিরে যাচ্ছিলেন। ক'জন ছাত্র সে সময় প্রধানমন্ত্রীর পথ আগলে দাঁড়ালো। এস ডি ও গোলাম আহমেদ ছাত্রদের এহেন কর্ম দেখে ভীষণ ক্ষেপে গেলেন। তিনি ছাত্রদের পথ ছেড়ে দিতে বললেন। কিন্তু ছাত্ররা নাছোড়বান্দা।

পরনে কালো আচকান আর মাথায় লাল ফেজ টুপির বিশালদেহী প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা সামনে এসে দাঁড়ালেন, বললেনঃ কি চাও তোমরা? তাদের মধ্য থেকে চিপচিপে লম্বা ছেলেটি সাহস করে জবাব দেয়_ আপনারা চলে যাচ্ছেন, আমাদের ছাত্রাবাসের কি হবে? চাল ফুটো, বৃষ্টি হলেই পানি পড়ে। মেরামত করা দরকার। শেরে বাংলা বললেন, কত টাকা দরকার? বারশ টাকা উত্তর দেয় কালো চশমা পরা ছেলেটি। প্রধামন্ত্রী তখনই পকেট থেকে বারশ টাকা বের করে দেন। ওরা ফিরে যাচ্ছিল ছাত্রাবাসে। শেরে বাংলার পেছনে দাঁড়িয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে অবাক হলেন এবং মনে মনে ছেলেটির সৎ সাহসের তারিফ করলেন। পরে বাংলয় ফিরে এস ডি ও সাহেবের মাধ্যমে ঐ কালো চশমা পরা ছেলেটিকে ডেকে পাঠালেন। ছেলেটিও এক বুক সাহস সঞ্চার করে প্রধানমন্ত্রী ও বাণিজ্য মন্ত্রীর কাছে গেলেন। তারা ছেলেটিকে কাছে বসালেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নাম কি? ছেলেটি উত্তর দেয় বাবা-মা আমাকে খোকা বলে ডাকে। স্কুলের খাতায় একটি ভাল নাম রয়েছে। শেরে বাংলা ছেলেটির কাঁধে হাত রাখলেন। আদর করে বললেন, আজ থেকে তুমি আমার নাতি। তোমার সৎ সাহস ও মনের দৃঢ়তা দেখে আমরা মুগ্ধ হয়েছি। কে জানতো এই ছেলেটিই হবে বাঙালি জাতির মহান স্থপতি, জাতির জনক।

ইসলামিক ফাইন্ডেশনের মাসিক প্রকাশনা অগ্রপথিক এর এপ্রিল ২০১৩ সংখ্যায় বাংলা একাডেমির উপ- পরিচালক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গবেষক ডক্টর জালাল ফিরোজ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সর্বকালীন শ্রেষ্ঠত্ব একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন, কেবল তাৎক্ষণিক প্রয়োজন নয়, ৭ মার্চের ভাষণে এমন অনেক উপাদান রয়েছে যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মানবিক ঔদার্য্য, সামরিক কৌশল এবং রাজনৈতিক আন্দোলন সংগঠন ইত্যাদি ক্ষেত্রে চিরকালীন ও সর্বজনীন স্বীকৃতিও লাভ করতে পারে। আমরা জানি, বঙ্গবন্ধু দীর্ঘদিন থেকে বাঙালিদের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সংগঠিত করছিলেন। ১৯৭০ এর নির্বাচনের পর নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর অবস্থান এক অতুলনীয় উচ্চতায় স্থাপিত হয়। তাঁর নির্দেশে সারা পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতি, প্রশাসন, সরকারি সকল বিভাগ ও প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছিল। কিন্তু ৭ মার্চের ভাষণে তিনি ইয়াহিয়ার সরকারের প্রতি কোনো ভয় বা হুংকার প্রদর্শন করেন নি বরং জনগণের পক্ষে সকল অন্যায় আচরণ থেকে মুক্তি কামনা করেন। সরকারের প্রতি অনুরোধ করেন: তাঁর মানুষকে যেন আর অত্যাচার ও নিষ্পেষণ না করা হয়। আবেগময় কন্ঠে তিনি বলেন, 'আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়।' বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার প্রতি আহব্বান জানান, 'জেনারেল ইয়াহিয়া খান সাহেব আপনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, দেখে যান কিভাবে আমার গরিবের উপর, আমার মানুষের বুকের উপর গুলি করা হয়েছে, কী করে আমার মায়ের কোল খালি করা হয়েছে, কী করে মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, আপনি আসুন, দেখুন, বিচার করুন।' গণতন্ত্রের প্রতি বঙ্গবন্ধুর সবসময় পূর্ণ আস্থা ছিল। তাঁর কাছে গণতন্ত্র মানে কেবল সংখ্যা গরিষ্ঠতার জোরে শাসন নয়। তিনি মনে করতেন, গণতন্ত্রে সংখ্যালগিষ্ঠ এমনকি একজনও যদি যুক্তিপূর্ণ কথা বলে তাহলে তার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। বাঙালিরা পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ, সংখ্যা বেশি হলে বাঙালিদের দাবি মানতে হবে এ-কথা কখনোও তিনি বলেন নি। বাঙালিদের দাবির যৌক্তিকতা তিনি সবসময় প্রতিষ্ঠা করেছেন। ৭ মার্চের ভাষণে তাই তার পক্ষে বলা সম্ভব হয়, ..... যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যা বেশি হলেও একজন যদিও সে হয় তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব।

এছাড়া প্রবন্ধে জগৎ বিখ্যাত ৪ টি ভাষণ, আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গ এড্রেস উইনস্টন চার্চিলের উইশ্যাল ফাইট অন দি বিচেস মার্টিন লুথার কিং এর আই হ্যাভ এ ড্রিম জহরলাল নেহেরুর এ ট্রাইস্ট উইথ ডেস্টিনির সাথে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রামই শেষ্ঠ ভাষণ। বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণ নিয়ে বিস্তৃত, গভীর অনুসন্ধান ও গবেষণা হোক। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরো স্বীকৃতি আসুক। এগিয়ে যাক বাংলাদেশ।

মো. সহিদুল ইসলাম : লেখক

এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আনার মতামত দিন।
মতামত দিতে চাইলে অনুগ্রহ করে করুন।
আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন।
সর্বাধিক পঠিত
ফটো গ্যালারি
আজকের পত্রিকা
আজকের নামাজের সময়সূচীনভেম্বর - ২৫
ফজর৫:০১
যোহর১১:৪৬
আসর৩:৩৫
মাগরিব৫:১৪
এশা৬:৩০
সূর্যোদয় - ৬:২০সূর্যাস্ত - ০৫:০৯
পুরোন সংখ্যা
বছর : মাস :
আজকের পাঠকসংখ্যা
২৬৯১.০
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতিঃ সৈয়দ এম. আলতাফ হোসাইন। সম্পাদক : আহ্সান উল্লাহ্। উপদেষ্টা সম্পাদক : মোঃ শাহাবুদ্দিন শিকদার। প্রকাশক ছৈয়দ আন্ওয়ার কর্তৃক রোমাক্স লিমিটেড, তেজগাঁও শিল্প এলাকা থেকে মুদ্রিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : খলিল ম্যানশন (৩য়, ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলা), ১৪৯/এ, ডিআইটি এক্সটেনশন এভিনিউ, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত। ফোন : ৯৩৫৭৭৩০ (বার্তা), ৮৩১৫৬৪৯ (বাণিজ্যিক), ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪.
ই-মেইলঃ djanata@dhaka.net
ফোনঃ ০২৮৩১৫১১৫, ০২৮৩১৫৬৪৯ ফ্যাক্সঃ ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪
Copyright The Dainik Janata © 2010 Developed By : orangebd.com.