নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা, সোমবার ৩০ নভেম্বর ২০২০, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৪ রবিউস সানি ১৪৪২
প্রশ্নবিদ্ধ স্বাস্থ্য খাত : দুষ্টচক্র নির্মূল করতে হবে
মো. এনামুল হক লিটন
একের পর এক অনিয়মে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে দেশের স্বাস্থ্য খাত। স্বাস্থ্য হলো মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্যতম একটি। দেশের যেকোনো সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার জনগণের দোরগোড়ায় চিকিৎসা সুবিধা পৌঁছে দেয়া। কিন্তু আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ এখনো আধুনিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। শুধু তাই নয়, পদে-পদে হচ্ছে প্রতারণার শিকার। এর উপর অপচিকিৎসা, ওষুধে ভেজাল ও খাদ্যদ্রব্যে বিষাক্ত রাসায়নিক মিশ্রণ মানুষকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। নকল-ভেজাল ওষুধ আর ভুয়া চিকিৎসক এ দু'য়ে মিলে আজ মানুষের জীবন বিপন্ন। দেশের গ্রামগঞ্জ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের দোকানগুলো ক্রেতাদের কাছে আসল ও কার্যকর ওষুধ বিক্রি করছে কিনা তা এখন একটি যেমন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, তেমনি চট্টগ্রামের অভিজাত এলাকা চান্দগাঁও থানার পুরান কালুরঘাটের তারানন্দ যুগী আশ্রমের কালী মন্দিরের সামনের একটি বিল্ডিং থেকে ভেজাল ওষুধ ও ওষুধ তৈরির সরঞ্জামাদি উদ্ধারের ঘটনায় সাধারণ মানুষ শঙ্কিত হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, গত ১৯ নভেম্বর চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি অভিযান দল রাতভর ওই বিল্ডিংয়ে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ভেজাল ওষুধ ও ওষুধ তৈরির সরঞ্জামাদিসহ এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে। পরদিন বিকেলে গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার মুহাম্মদ আলী হোসেন সাংবাদিকদের জানান, গ্রেফতারকৃত মোহাম্মদ হোসেন নামের ওই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে নামিদামি কোম্পানির ওষুধের নাম ব্যবহার করত এবং সেগুলো ভেজালভাবে প্রস্তুত করে উচ্চ দামে বাজারজাত করে আসছিল। এসব নকল ওষুধ খেলে মানুষের স্বাস্থ্যে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি এসব ওষুধ তৈরিতে বিভিন্ন কেমিক্যাল ব্যবহার করত এবং কারিহো ল্যাবরেটরিজ নাম দিয়ে ওষুধগুলো বাজারে বিক্রি করত। ওই অভিযানে প্রায় ২৫ লাখ টাকার ওষুধ ও ওষুধ তৈরির সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। অপরদিকে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলায় ১৪৪ জন ভুয়া চিকিৎসকের সন্ধান মিলেছে। যারা সবাই নামের আগে 'ডাক্তার' লিখেন। একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, চলতি বছরের ২৭ জুলাই পটুয়াখালীর বাউফল থানার একটি জিআর মামলায় একজন হাজতিকে তার আইনজীবী বিজ্ঞ আদালতে হাজির করেন। একইসঙ্গে একটি প্রেসক্রিপশন দাখিল করে হাজতিকে অসুস্থ বলে দাবি করেন তিনি। বিজ্ঞ আদালত সেটি পর্যালোচনা করে দেখেন, পেসক্রিপশন প্রদানকারি ডাক্তার এমবিবিএস ডিগ্রিধারী নন। এমনকি বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন ২০১০-এর অধীন নিবন্ধিতও নন। প্রেসক্রিপশনে ওই মহিলা ডাক্তার তার ডিগ্রি হিসেবে বিভিডি-এ ঢাকা উল্লেখ করেন। বিজ্ঞ আদালত সেদিনই ওই ডাক্তারের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করার পাশাপাশি পটুয়াখালীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্র্রেট মোহাম্মদ শিহাব উদ্দিন স্বঃপ্রণোদিত হয়ে বাউফল উপজেলায় অনিবন্ধিত অন্য কোনো চিকিৎসক রয়েছে কিনা তা, ন্যায় বিচারের স্বার্থে তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে আদেশ দেন। এজন্য তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন ২০১০-এর অধীন নিবন্ধিত নন; কিন্তু চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে বেআইনিভাবে চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন, তদন্তের মাধ্যমে এমন ব্যক্তিদের একটি তালিকা প্রণয়ন করে আদালতে জমা দিতে বাউফল সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেন। বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশ মোতাবেক ওই সহকারী পুলিশ সুপার সমপ্রতি ১৪৪ জন ভুয়া চিকিৎসকের একটি তালিকা আদালতে জমা দেন। একটি উপজেলায় ১৪৪ জন ভুয়া চিকিৎসকের অস্তিত্ব পাওয়া যাওয়ায় সাধারণ মানুষ বিস্মিত ও শঙ্কিত হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে করোনার এ সময়ে দেশের স্বাস্থ্য খাতের এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগছে- এতোদিন আমরা প্রতারিত, অর্থ অপচয় ছাড়াও ভুয়া চিকিৎসকের অপ-চিকিৎসা ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ সেবন করে নিজেদের জীবনকে তিল-তিল করে শেষ করেছি। অন্তহীন সমস্যার দেশ বাংলাদেশ। এদেশে কৃষক-শ্রমিক, মেহনতি মানুষ, শিশু-বৃদ্ধ, তরুণ কেউই শান্তিতে স্বস্তিতে নেই। একদিকে অভাব-অনটন অন্যদিকে বিভিন্ন ব্যবস্থা অব্যবস্থা মানুষকে প্রতিদিনই নিত্য-নতুন সমস্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সরকারি প্রশাসন, সেবা সেক্টরগুলো যদিও জনগণের কল্যাণ ও সেবার জন্য প্রতিষ্ঠিত; কিন্তু বাস্তবতাটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভিন্ন অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়। শুধু বাউফল নয়, ঢাকা-চট্টগ্রামসহ সারাদেশে ভুয়া চিকিৎসক আর ভেজাল ওষুধের বহু পিলে চমকানো তথ্য অতীতে দেশের পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। এখনো হচ্ছে।

এসব সংবাদ কতটা ভয়ংকর ও উদ্বেগের তা বলার অপেক্ষা রাখে না! কেবল এক উপজেলায় যদি ১৪৪ জন ভুয়া চিকিৎসকের সন্ধান মেলে, তাহলে সারাদেশে কত ভুয়া চিকিৎসক রয়েছেন, তা বলা মুশকিল। ভুয়া চিকিৎসক আর ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর ঘটনা প্রায়শই পত্রিকান্তরে প্রকাশ পায়। এনিয়ে নানা অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে। তবুও কমছে না এদের দৌরাত্ম্য। বরং ধর-পাকড় শুরু হলে, কিছুদিন চেম্বার গুটিয়ে নতুবা নামের আগে বসানো 'ডাক্তার' লিখাটি কৌশলে মুছে ওষুধ বিক্রেতা সেজে দিব্যি প্রতারণা চালায়। এসব ভুয়া চিকিৎসকের কেউ- কেউ রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছে। অধিকাংশ ভুয়া চিকিৎসক নগরীর বস্তি এলাকাগুলোকে টার্গেট করে। চট্টগ্রামের বাকলিয়া, বায়েজিদ, চাঁন্দগাঁও, কর্ণফুলীসহ বিভিন্ন এলাকার বস্তিগুলোতে টার্গেট করে ভুয়া চিকিৎসকরা চাকচিক্য চেম্বার খুলে বাহারি সাইন বোর্ডে 'ডাক্তার' ও বিভিন্ন উপাধি লিখে অশিক্ষিত অজ্ঞ মানুষের সাথে প্রতারণা করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। তাদের চেম্বারে ফার্মেসিসহ থাকায় নিম্নমানের ওষুধগুলোই তারা প্রেসক্রাইব করে। অতীতে তারা গ্রেফতার হলেও বেরিয়ে এসে আবারো একই কর্মে লিপ্ত হয়েছে। এসব চিকিৎসকরা খৎনা থেকে শুরু করে পায়ের তালু থেকে মাথার তালু পর্যন্ত চিকিৎসার বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিজেকে জাহির করে অপচিকিৎসা দেয়। একই সাথে নকল-ভেজাল এবং নিম্নানের ওষুধও বিক্রি করে। থানা পুলিশের নাকের ডগায় বসেও কেউ-কেউ প্রতারণা অব্যাহত রেখেছে। এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে দেশের মানুষ কোনো চিকিৎসকের উপর আস্থা রাখতে পারবেন? প্রায় ডাক্তারের নামের পাশে কয়েক লাইন ধরে নানা রকম ডিগ্রি লিখা থাকে। সাধারণ মানুষের পক্ষে এসব ডিগ্রির অর্থ বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। আর এটাই তাদের বড় ধরনের বাণিজ্য। মানুষকে বোকা বানানোর এ ধরনের সাইনবোর্ড প্রশাসনের সামনেই ঝুলছে। সামপ্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় এ ধরনের চিকিৎসকদের খোঁজে বের করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছে। পাশাপাশি পুলিশ র‌্যাবও অভিযান চালিয়ে কিছু ভুয়া চিকিৎসকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নিয়েছে। তাতে কাজের কাজ কতটুকু হয়েছে, তা বলা যাচ্ছে না। যারা জনগণের সাথে এ ধরনের জঘন্য প্রতারণা করছে, তারা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করছে। সুতারাং কোনোভাবে তাদের ছাড় দেয়া হলে, মানুষের স্বাস্থ্যসেবা চরম হুমকির মুখে পড়বে। এসব ভুয়া চিকিৎসকরা ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ব্যক্তিগত চেম্বার বা ফার্মেসিতে বসে রোগী দেখেন। তারা বাহারি সাইনবোর্ডও ভিজিটিং কার্ডে যেসব ডিগ্রি ব্যবহার করছেন, তার সবই ভুয়া। ইতিপূর্বে অনেক কথিত চিকিৎক তাদের ডিগ্রি সংক্রান্ত তথ্য সঠিক নয় বলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কাছে স্বীকারও করেছেন। অনেকে একাধিক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ডিগ্রিও ব্যবহার করেছেন। এদের মধ্যে কেউ- কেউ অল্টারনেটিভ মেডিসিন (এএম) বা বিকল্প চিকিৎসা বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন মাত্র। এদের হাতে রোগীর জীবন মোটেই নিরাপদ নয়। এই প্রতারণার সাথে যারা জড়িত তাদের কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত । কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত তাদেরও যারা নকল- ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ বেচা-বিক্রির সাথে জড়িত। শুধু পটুয়াখালীর বাউফল, ঢাকা-চট্টগ্রাম নগরীই নয় দেশের কোনো এলাকার মানুষই নকল ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ক্ষতিকর ওষুদের আওতা থেকে মুক্ত নয়। এর শিকার রোগ নিরাময় প্রত্যাশী দেশের প্রত্যেক এলাকার মানুষ। অর্থ সম্পদ খরচ করে যে মৃত্যুকে ঠেকানোর জন্য রোগাক্রান্ত মানুষের আকুল প্রচেষ্টা, সেই মৃত্যুকেই যে আহ্বান করা হচ্ছে ওই সব বিপজ্জনক ওষুধ সেবন করে তা অনেক হতভাগ্য রোগীর ও তাদের অভিভাবকদের অজানা থেকে যায়। এ নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে সংবাদপত্রে। কিন্তু জনঅকল্যাণকর এ হীন ব্যবসা বা প্রতারণা বন্ধে কেউ কখনো এগিয়ে আসেনি। দেশে চলমান এমন প্রাণঘাতী আয়োজন বন্ধ করতে হবে। আর তাই ভুয়া চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ, জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তা, ওষুধ শিল্পের মঙ্গল বিধান এবং রোগ নিরাময় প্রত্যাশী মানুষের জীবন রক্ষা ও ক্রেতাস্বার্থ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ওই দুষ্টচক্রকে স্থায়ীভাবে নির্মূলের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভেবে দেখবেন। এমনটাই প্রত্যাশা আমাদের।

মো. এনামুল হক লিটন : লেখক

এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আনার মতামত দিন।
মতামত দিতে চাইলে অনুগ্রহ করে করুন।
আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন।
সর্বাধিক পঠিত
ফটো গ্যালারি
আজকের পত্রিকা
আজকের নামাজের সময়সূচীজানুয়ারী - ১৫
ফজর৫:২৩
যোহর১২:০৮
আসর৩:৫৭
মাগরিব৫:৩৬
এশা৬:৫৩
সূর্যোদয় - ৬:৪২সূর্যাস্ত - ০৫:৩১
পুরোন সংখ্যা
বছর : মাস :
আজকের পাঠকসংখ্যা
৯৬৫৭.০
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতিঃ সৈয়দ এম. আলতাফ হোসাইন। সম্পাদক : আহ্সান উল্লাহ্। প্রকাশক ছৈয়দ আন্ওয়ার কর্তৃক রোমাক্স লিমিটেড, তেজগাঁও শিল্প এলাকা থেকে মুদ্রিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : খলিল ম্যানশন (৩য়, ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলা), ১৪৯/এ, ডিআইটি এক্সটেনশন এভিনিউ, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত। ফোন : ৯৩৫৭৭৩০ (বার্তা), ৮৩১৫৬৪৯ (বাণিজ্যিক), ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪.
ই-মেইলঃ djanata123@gmail.com, bishu.janata@gmail.com
ফোনঃ ০২৮৩১৫১১৫, ০২৮৩১৫৬৪৯ ফ্যাক্সঃ ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪
Copyright The Dainik Janata © 2010 Developed By : orangebd.com.