নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা, বৃহস্পতিবার ৭ ডিসেম্বর ২০১৭, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯
দুর্নীতি-রাজনীতিবিদ এবং ওবায়দুল কাদের বচন
মীর আব্দুল আলীম
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সততা ও সাহস থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। আমরা রাজনীতিবিদরা যদি দুর্নীতিমুক্ত থাকি, দেশে দুর্নীতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্ধেক কমে যাবে। গত ২৫ নভেম্বর বিএমএ মিলনায়তনে মন্ত্রী এমন হক কথা বলেছেন। কথাটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে। দুর্নীতির দুর্নাম ঘুচাতে সবার আগে রাজনীতিবিদদের দুর্নীতির জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। রাজনীতিবিদরা দুর্নীতিতে না জড়ালে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি কমে যাবে। অফিস আদালত, সচিবালয়, মন্ত্রণালয়ে আতংক তৈরি হবে। দুর্নীতি অনেকটাই রোধ হবে।

জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে গত ২৭ জুলাই (২০১৭) মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতি উচ্ছেদের কথা বলেছেন। জেলা প্রশাসকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, 'এই বাংলার মাটি থেকে করাপশন উৎখাত করতে হবে। বাংলার কৃষকরা করাপশন করেন না। করাপশন মজদুর করে না। করাপশন করি আমরা শিক্ষিত সমাজ। যারা ওই কৃষক ও মজুরের টাকায় লেখাপড়া করে শিক্ষিত হয়েছি।' চমৎকার কথা। এমন কথায় অমত কারও হওয়ার কথা না। দেশ থেকে দুর্নীতি উচ্ছেদে প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণাকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। আন্তর্জাতিকভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একজন সৎ রাজনীতিবিদ তা প্রমানিত হয়েছে। সততার দিক থেকে তিনি বিশ্বের তৃতীয় প্রধান নেতা বিশ্ব তা স্বীকৃতি দিয়েছে। সৎ রাজনীতিবিদদের মধ্যে খুবই সামান্য পয়েন্ট ব্যবধানে শেখ হাসিনার চেয়ে এগিয়ে আছেন জার্মানির অ্যাঞ্জেলা মার্কেল ও সিঙ্গাপুরের লী। তিনি (প্রধানমন্ত্রী) সৎ মানুষ এটা স্বীকার করতেই হয়। এ কথা বলতে হয়, তিনি দুর্নীতি চান না বলেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ১২২ ভাগ বেতন বৃদ্ধি করেছেন। আমরা নামে যাদের খুব বেশি চিনতাম না, জানতাম না, দুর্নীতি রোধের ইচ্ছায় তিনি তাদেরও মন্ত্রিসভায় এনেছেন। দুর্নীতি রোধে প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা আছে, তা না বলে উপায় নেই। এর পরও অসৎ রাজনীতিবীদ, অসৎ চাকুরে, আমলাদের কারণে দেশ দুর্নীতির দুর্নাম ঘুচাতে পারছে না কেন?

দুর্নীতি! এটা এদেশে বহুল পঠিত এবং চর্চিত একটি শব্দ। দুর্নীতির সর্বগ্রাসী থাবা থেকে কীভাবে মুক্ত হওয়া যায়,এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আমাদের বুঝতে হবে যে, দেশে কেন দুর্নীতি হয় বা দুর্নীতি বিস্তারের প্রক্রিয়া কীভাবে বৃদ্ধি পায়। সার্বিকভাবে দেখলে দুর্নীতির ব্যাপকতার সাথে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের একটি সম্পর্ক আছে। একথার সত্যতা স্বীকার করে নিয়ে বলতে হয় যে, কেবল মূল্যবোধের অবক্ষয় বাংলাদেশের দুর্নীতির ব্যাপক প্রসারের প্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করতে পারে না। কেননা দুর্নীতি পৃথিবীর সব দেশেই কম-বেশি হয়। কিন্তু বাংলাদেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা জনগণের মনে যে পরিমাণ হতাশার সৃষ্টি করে, তা তুলনাহীন। দুর্নীতি কেবল ওপর-মহলে হয়, তাই নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে জনগণকে দুর্নীতির প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে বাধ্য করা হয়। এই অংশগ্রহণের কারণ সব ক্ষেত্রেই শুধু লোভ নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই হচ্ছে নূ্যনতম জীবনযাপনের প্রচেষ্টা। এই অসহায়ত্বের সাথে যুক্ত হয়েছে চোখের সামনে ঘটে যাওয়া দৃষ্টান্তের। যেখানে দুর্নীতির সাথে সংশ্লিষ্টদের শাস্তির সুযোগ নেই বরং জনগণকে মূল্য দিতে হয় সৎ থাকার জন্য।

ঘুরে ফিরেই প্রশ্ন জাগে এদেশে ঘুষ দুর্নীতি বন্ধ হবে কবে? সমাজের প্রতিটি স্তরে ঘুষ, দুর্নীতি ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। এ ব্যাধি থেকে নিস্তার পাওয়ার পথ হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্রের বেশকিছু ক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কার সাধন করা এবং উন্নয়ন ঘটানো। এ জন্য আমাদের রাজনীতিক, মন্ত্রী, আমলা আর দেশের মানুষের মানসিকতার পরিবর্তনেরও কোনো বিকল্প নেই। আরেকটি উদাহরন না টানলেই নয়। আমাদের আইনমন্ত্রী ক'মাস আগে বলেছেন, ্তুআদালতের ইটেও ঘুষ খায়। অপ্রিয় হলেও সত্য কথা বলার জন্য মন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। এমন অবস্থায় বলতে হয় বিচারপতি তোমার বিচার করবে কারা? যেখানে দেশ এবং রাজনীতিতে সত্যের আকাল সেখানে মন্ত্রীবচন বাণীর মতোই মনে হয়েছে আমার।

রাষ্ট্রের অন্যতম জায়গা এই বিচার বিভাগ। এই বিচার বিভাগকে নিয়ে একজন মন্ত্রীর এমন মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, দেশের ঘুষ দুর্নীতি কোন স্তরে রয়েছে। চলতি বছর টিআইবি'র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক দল, পুলিশ, বিচার বিভাগ ও ভূমি সেবায় উদ্বেগজনক হারে দুর্নীতি বেড়েছে বলে দেশের ৬৫ শতাংশ মানুষ মনে করেন। বাংলাদেশে দুর্নীতি বেড়েছে এবং রাজনৈতিক দলগুলো দুর্নীতির শীর্ষস্থানে রয়েছে। ৯৩ শতাংশের ধারণা, বাংলাদেশে সর্বোচ্চ দুর্নীতিপ্রবণ খাত বা প্রতিষ্ঠান হলো-রাজনৈতিক দল ও পুলিশ। আর ৮৯ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, এর পরের খাতই হলো বিচারব্যবস্থা। প্রতিবেদনে বলা হয়, ৭৬ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, সরকারি খাতে দুর্নীতি খুবই গুরুতর সমস্যা।

পৃথিবীর সবদেশেই কম বেশি দুর্নীতি আছে, এই কথাটির আপেক্ষিক সত্যতা মেনে নিয়েও, বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় দুর্নীতির ব্যাপকতাকে অস্বীকার করার কোনো অজুহাত নেই। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যে এই দুর্নীতি যা আগেই বলেছি, জনগণের মনে ব্যাপক হতাশাবোধের জন্ম দিয়েছে। এই হতাশাবোধের মূল কারণ হচ্ছে, দেশের রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্যকর ভূমিকা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম জনগণকে আশ্বস্ত করতে পারছে না। একটি গণতান্ত্রিক এবং স্বাধীন সমাজ ব্যবস্থার প্রধানতম ভিত্তি হওয়ার কথা এসব প্রতিষ্ঠানের। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অগ্রগণ্য হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, সংবাদ মাধ্যম, সরকারি ও বেসরকারি আমলাতন্ত্র, জাতীয় সংসদ, সরকারি ও বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং ব্যক্তিখাত। আমরা বিগত কয়েক দশক ধরে এসব প্রতিষ্ঠানকে ক্রমে ধ্বংস বা অকার্যকর করার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চালিত করেছি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে যে মূল উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে দুর্নীতি।

পুরান দিনের কথা একটু না বললে নয়। ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার রচিত 'মুচিরাম গুড়' নামক প্রবন্ধে লিখেছেন, বাঙ্গালা দেশে মনুষ্যত্ব বেতনের ওজনে নির্ণীত হয়। কে কত বড় বাঁদর তার লেজ মাপিয়া ঠিক করিতে হয়। তখনকার কেরানী আর চাপরাশিদের চুরিচামারি করে সামান্য ঘুষ গ্রহণের নমুনা দেখেই লিখেছেন এমন অধঃপতন আর কোনো দেশের হয় নাই। ভাগ্যিস বেঁচে নেই সেই সুপ্রসিদ্ধ ঔপন্যাসিক। তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো বর্তমান ভয়াবহ পরিস্থিতিতে এদেশের দুর্নীতিবাজ ও ঘুষখোরদের বিরুদ্ধে তার লেখনিতে মহাপ্রলয় ঘটিয়ে ছাড়তেন। হালে দেশে দুর্নীতির আর ঘুষের অবাধ স্বাধীনতায় সাধারণ মানুষ হতাশ। আমরা ভাগ্যাহত এ কারণে যে, এ দেশের জ্ঞান পাপিরা শিক্ষার পাহাড় মাথায় নিয়ে নির্বিচারে নির্লজ্জ ঘুষ গ্রহণ করে চলেছে। আরো হতবাক হই যখন দেখি দেশের নীতিনির্ধারক রাজনীতিক, আমলা, মন্ত্রী, এমপিদের হরেদরে ঘুষ দুর্নীতির অভিযোগ পত্র-পত্রিকায় উঠে আসে।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি বিখ্যাত কবিতার দু'টি চরণ মনে পড়ছে আমার তিনভাগ গ্রাসিয়াছো একভাগ বাকী/সুরা নাই পাত্র হাতে কাঁপিতেছে সাকী। তিন বছর আগ পর্যন্ত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল তাদের বাৎসরিক প্রতিবেদনে পাঁচ বছর এক নাগাড়ে বাংলাদেশকে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে অভিহিত করেছে। এমনিতেই দেশের সব মানুষই সমাজে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতির দৌরাত্ম্যের সাথে কমবেশি পরিচিত, কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে দুর্নীতির দায়ে অপদস্থ হওয়ায় দেশের সব সচেতন মানুষের মনে এক ব্যাপক গ্লানিবোধ সঞ্চারিত হয়। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বাংলাদেশের কিংবা ওইসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বাংলাদেশিদের কেমন যেন পালিয়ে থাকার মতো অবস্থা। পরিস্থিতি এতই নৈরাশ্যজনক যে, রাষ্ট্র এবং সুশীল সমাজ দুর্নীতির এই বিস্তার প্রতিরোধে ক্রমাগত উদ্যমহীন হয়ে পড়েছে। পরিবারগুলোও তার বাইরে নয়। স্ত্রী প্রশ্ন করছে না, স্বামীর হঠাৎ টাকা প্রাপ্তির উৎস কি? প্রশ্ন করছেন না পিতা-মাতা বা সন্তানরাও। প্রার্থনাগারের হুজুরও যেন 'ছলে বলে কৌশলে' টাকার পাহাড় গড়া ব্যক্তিটির মঙ্গল কামনায় বারবার কেঁদে ওঠেন মোনাজাতে।

দুর্নীতির এই সর্বগ্রাসী থাবা থেকে কীভাবে মুক্ত হওয়া যায় এটাই এখন ভাবুন? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাদের কেন দুর্নীতি হয় বা দুর্নীতি বিস্তারের প্রক্রিয়া কীভাবে বৃদ্ধি পায় তা আগে খুঁজে বের করতে হবে। সার্বিকভাবে দেখলে দুর্নীতির ব্যাপকতার সাথে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের একটি সম্পর্ক আছে। একথার সত্যতা স্বীকার করে নিয়ে বলতে হয় যে, কেবল মূল্যবোধের অবক্ষয় বাংলাদেশের দুর্নীতির ব্যাপক প্রসারের প্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করতে পারে না। জনগণের কাছে এই ধারণা ক্রমেই দৃঢ় হয়েছে যে, সমাজে নীতিবান হয়ে থাকার মাঝে কোনো গৌরব নেই বরং আছে বহু ভোগান্তি। সমাজের সুশীল অংশেও ন্যায় অন্যায়ের সংজ্ঞা পরিষ্কার নয়। অন্যদিকে বেআইনি পথে থাকার সুবিধা রয়েছে অনেক। জনগণের মনে এই ধারণা যত ক্রমবিকাশমান হচ্ছে, হতাশা তত বৃদ্ধি পাচ্ছে, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে বিরূপতা তত বেশি বেড়ে যাচ্ছে। এই হতাশার ফল ধরে আমরা হয়ে যাচ্ছি বছরের পর বছর দুর্নীতিতে শীর্ষস্থানীয় একটি দেশ।

এভাবে চলতে পারে না। আর চলতে দেয়া ঠিক হবে না। দুর্নীতির যে ধারা আমরা সৃষ্টি করেছি, সেই ধারণাকে বদলাতে হবে আমাদেরই। এদেশ আমাদের সবার, তাই আমাদের সবার মিলিত প্রতিরোধে সমাজের সব অনাচার দূর করা সম্ভব।এ ক্ষেত্রে সরকারেরও সঠিক ভূমিকা থাকতে হবে। আর এসব বিষয়ে সরকার জনতার ন্যায্য সমর্থন পাবে বলেই আমার বিশ্বাস। বর্তমান সরকারের সাফল্যের অনেক নজির আছে তা অস্বীকার করার জো নেই। শত কিছুর পরও প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যায়নি কখনো। তবে গত দুই বছরে মন্ত্রী-এমপি ও তার সরকারের প্রশ্নবিদ্ধ দুর্নীতির তালিকা কম নয়। এ ব্যাধি থেকে নিস্তার পাওয়ার পথ হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্রের বেশকিছু ক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কার সাধন করা এবং উন্নয়ন ঘটানো। এ জন্য আমাদের রাজনীতিক, মন্ত্রী, আমলা আর দেশের মানুষের মানসিকতার পরিবর্তনেরও কোনো বিকল্প নেই।

মীর আব্দুল আলীম : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আনার মতামত দিন।
মতামত দিতে চাইলে অনুগ্রহ করে করুন।
আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন।
সর্বাধিক পঠিত