নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা, বৃহস্পতিবার ৭ ডিসেম্বর ২০১৭, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯
বিশ্বনবী বলো না! মহানবী (স:)
মো. ইসমাইল হোসেন
ইসলামী পরিভাষায় আলম শব্দের অর্থ জগৎ। এটাকে বহু বচনে বলা হয় আলামীন অর্থাৎ জগৎসমূহ। কোরআন মাজিদের সূরাতুল ফাতিহা'র প্রথম আয়াতে বলা হয়েছে,'আল্হামদু-লিল্লাহি রবি্বল আলামীন' অর্থাৎ প্রশংসা সেই রবের, যিনি জগৎসমূহের মালিক। কিছু কিছু গ্রন্থে আলামীন শব্দের অর্থ করা হয়েছে নিখিল জাহান। কিন্তু নিখিল জাহান বলতে আল্লাহর সৃষ্টি জগতের বহুমাতৃকতা প্রকাশ পায় না। ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত কোরআন বাংলায় ভাষান্তর করেছেন গ্রীসচন্দ্র সেন। সে কারণে মনে করা হয়, নিখিল জাহান শব্দটি হয়তো ভারতীয় বাংলা থেকে আগত। সুতরাং আলামীন শব্দের বাংলা যথার্থ অর্থ প্রকাশ করতে জগৎসমূহ বা সকল জগৎ বলাই উত্তম। পৃথিবীতে যুগে যুগে বহুনবী ও রাসুলগণের আগমন ঘটেছে। তার মধ্যে মুহাম্মাদুর রাসুল্লাহ (স.) সর্বশেষ নবী ও রাসুল (স.)। এ ব্যাপারে কোরানুল কারীমের সূরা আহযাব, আয়াত নং-৪০ এ বলা হয়েছে,'মা-কা-না মুহাম্মদুন্ আবা-আহাদিম মির্ রিজা-লিকুম ওয়ালা-কির রাসুল্লা-হি ওয়া খা-তামান নাবিয়্যীন' অর্থাৎ মুহাম্মদ (স.) তোমাদের পুরুষদের মধ্যে হতে কারো পিতা নন, বরং তিনি আল্লাহর রাসুল ও নবীদের শেষ নবী।

সুতরাং উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটি পরিষ্কার যে, মুহাম্মদ (স.) শেষনবী ও রাসুল। এর পর আর কোনো নবী-রাসুলের আগমন ঘটবে না। বিভিন্ন হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, হযরত মুহাম্মদ (স.)কে বলা হয়েছে সাইয়্যেদুল মুরসালিন, রহমাতাল-লিল্ আলামীন। অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদ (স.) হলেন সকল নবী ও রাসুলগণের সরদার এবং তাঁকে মহান আল্লাহ জগৎসমূহে রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছেন। সুতরাং এখানে বিষয়টি পরিষ্কার যে, মহান আল্লাহর যতগুলো জগৎ রয়েছে এবং সেখানে যা-কিছু সৃষ্টি রয়েছে, সকল কিছুর ওপর শ্রেষ্ঠত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করে মুহাম্মদ (স)কে প্রেরণ করা হয়েছে।

এক সময়ের কবি ও খ্যাতনামা সাহিত্যিক কবি গোলাম মোস্তফা। তিনি তার সময়ে নিঃসন্দেহে একজন সাহিত্য গবেষক ও প-িত ব্যক্তি ছিলেন। তবে তার সময়কার ভাষার গবেষণা এবং আধুনিক যুগের ভাষার গবেষণায় যথেষ্ট তফাত রয়েছে। কবি গোলাম মোস্তফার সাহিত্য গবেষণায় বিশেষ করে রাসুল (স.)'র জীবনী পর্যলোচনায় 'আল্ আলামিন' শব্দের প্রকৃত অর্থ উদঘাটন করতে পারেননি। অন্যদিকে সে কালের সাহিত্য গবেষণা দিয়ে, মুহাম্মদ (স.)'র দায়িত্বের পরিধি, প্রকৃত সম্মান ও মর্যাদা কবি গোলাম মোস্তফা উপলব্ধি করতে পারেননি। আর সে কারণেই তার সাহিত্য গবেষণায় হযরত মুহাম্মদ (স.)'র প্রকৃত সম্মান ও মর্যাদা প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। হযরত মুহাম্মদ (স.)কে কবি গোলাম মোস্তফা তার সাহিত্য গবেষণায় মহানবীরূপে প্রকাশ না করে, বিশ্বনবীরূপে প্রকাশ করেছেন। সাহিত্যের দূরদর্শী গবেষণাই এ জন্য দায়ী।

এমতাবস্থায় কবি গোলাম মোস্তফা 'সাইয়্যেদুল মুরসালীন, রহমাতুল-লিল আলামীন, আখেরি জামানার নবী হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর জীবনী বাংলায় সংকলিত করার পরিকল্পনা করেন। সংকলিত সকল তথ্য-উপাত্ত একটি গ্রন্থে সনি্নবেশীত করে নাম দিলেন 'বিশ্বনবী' (স.)'র জীবনী। আমার জানা মতে মহানবী (স)'র জীবনীর ওপর বাংলা ভাষায় এটাই প্রথম গ্রন্থ। এই জীবনী গ্রন্থটি পড়ে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে আলেম-উলামাগণ ওয়াজ-মাহফিল, ইসলামী সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে হযরত মুহাম্মদ (স.)কে বিশ্বনবীরূপে প্রচার করেছেন এবং ভাষার গভীর গবেষণা না করে আজো অনেক আলেম-উলামাগণ মহানবীকে, 'বিশ্বনবী' রূপে প্রচার করে যাচ্ছেন। আমাদের উপলব্ধি করতে হবে বিশ্বনবী এবং মহানবীকে।

মানুষের দৃষ্টিগোচরিভূত ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে যে পরিমাণ ভূমি, যার মধ্যে বিভিন্ন দেশের অবস্থান। এ ছাড়া জলরাশি, সাগর-মাহসাগর এ সমস্তকে একত্রে বিশ্ব বলায়। এরপর আকাশ, চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র, তারকারাজিসমূহ সমন্বয় করে বলা হয় মহাবিশ্ব। কিন্তু মানুষের দৃষ্টির বাইরেও স্রষ্টার অনেক সৃষ্টি রয়েছে যা কোনো মানুষ এখন পর্যন্ত উপলব্ধি করতে পারেনি বা কোনো বিজ্ঞানীরাও এখন পর্যন্ত আবিষ্কার করতে পারেনি। কোরআন-হাদিসের আলোকে মহান আল্লাহর সৃষ্টি জগৎ সম্পর্কে ধারণা লাভে মুহাম্মদ (স.)'র সবেমিরাজ'র ঘটনা থেকে এখানে একটি তথ্য উদ্ধৃতি করা প্রয়োজন বলে মনে করি। সবেমিরাজে সফরকালীন সময়ে হযরত মুহাম্মদ (স.) দেখলেন, পৃষ্ঠে বাঙ্ বহনকারী একদল উট একদিক থেকে অন্যদিকে যাচ্ছে। উটের বহর এতটা দীর্ঘ ছিল যে, উটগুলো কোথা থেকে আসছে এবং কোথায় যাচ্ছে তা ঠাহর করা সম্ভব ছিল না। মুহাম্মদ (স.) জানতে চাইলেন উটের পৃষ্ঠে বাঙ্গুলোতে কি রয়েছে। জিব্রীল আমিন বললেন, আপনি উট দাঁড় করে দেখতে পারেন। মুহাম্মদ (স.) উট দাঁড় করে দেখলেন, উটের পৃষ্ঠে প্রত্যেকটি বাঙ্ েএকটি করে জগতের ছবি রয়েছে। এ সময় জিব্রীল আমিন জানালেন, এরূপ ৮০ হাজার জগৎ রয়েছে।

পৃথিবীতে বহু নবী ও রাসুলগণের আগমন ঘটেছে। যাঁরা বিশ্বজগতের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থান করে আল্লাহর হুকুম তামিল করেছেন। আখেরি জামানার নবী মুহাম্মদ (স.) ও আল্লাহর হুকুম তামিল করেছেন, তবে তাঁর দায়িত্বের পরিধি ছিল ব্যাপক ও বিস্তৃত। শুধু বিশ্বজগৎ নয়, মানুষের দৃষ্টিগোচরের বাইরেও আল্লাহর যে সমস্ত সৃষ্টি রয়েছে, সেখানেও মুহাম্মদ (স.)-এর দায়িত্ব, মর্যাদাপূর্ণ সম্মান এবং রহমতস্বরূপ প্রেরণ করে মহাগ্রন্থ আল কোরআন দ্বারা সত্যায়ন করেছেন। আল্লাহ বলেন, 'ওয়ামা আরসাল্না-কা ইল্লা-রহ্মাতাল লিল্ আ-লামীন' অর্থাৎ আমি তো আপনাকে জগৎসমূহে রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি সূরা আম্বিয়া, আয়াত নং ১০৭। অন্যান্য নবীদের দায়িত্ব ছিল শুধুমাত্র বিশ্বজগতে কিন্তু মুহাম্মদ (স.)-এর দায়িত্ব জগৎসমূহের যাবতীয় সৃষ্টির ওপর।

আমাদের পৃথিবী আল্লাহর সৃষ্টি জগৎসমূহের একটি। পৃথিবীর মধ্যে প্রায় ২শটি রাষ্ট্রের সমন্বয় গঠিত হয়েছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের প্রধানকে বলা হয় মহাসচিব। এখন বেমালুম জাতিসংঘের প্রধানকে কেউ যদি কোনো রাষ্ট্র প্রধানের সাথে তুলনা করে, সেটা যেমন বেমানান, অসত্য, কাল্পনিক এবং দ-নীয় অপরাধ, মুহাম্মদ (স.)কে বিশ্বনবী বলা তেমনি অপরাধ। কারণ, শুধু বিশ্ব কেন? মুহাম্মদ (স.) পৃথিবীর মতো ৮০ হাজার জগতের শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী নেতা ও পথ প্রদর্শক। সুতরাং মুহাম্মদ (স.) নির্দিষ্ট কোনো সম্প্রদায়ের নবী নন, তিনি সার্বজনীন।

সুতরাং মহান আল্লাহর যতগুলো জগৎ রয়েছে, প্রত্যেক জগতে যতরকম সৃষ্টি রয়েছে প্রত্যেকের উপর রহমতস্বরূপ এবং শ্রেষ্ঠত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করে হযরত মুহাম্মদ (স.)কে প্রেরণ করা হয়েছে। তা'হলে এতবড় সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী এবং দায়িত্বপ্রাপ্তকে কিভাবে 'বিশ্বনবী' বলা যায়? হযরত মুহাম্মদ (স.)কে বিশ্বনবী বললে, তার দায়িত্ব ও মর্যাদাকে খাটো করে দেখা হয়। তাই হযরত মুহাম্মদ (স.)কে 'বিশ্বনবী' নয়, মহানবী বলাই শ্রেয়।

মো. ইসমাইল হোসেন : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আনার মতামত দিন।
মতামত দিতে চাইলে অনুগ্রহ করে করুন।
আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন।
সর্বাধিক পঠিত