নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা, বৃহস্পতিবার ৮ এপ্রিল ২০২১, ২৫ চৈত্র ১৪২৭, ২৪ শাবান ১৪৪২
উইঘুর ইস্যুতে বিশ্বমানবতার এক হওয়ার দাবি
মো. জাফর আলী
উইঘুররা পূর্ব ও মধ্য এশিয়ায় বসবাসরত তুর্কি বংশোদ্ভূত ও একটি সুনি্ন মুসলিম সমপ্রদায়। যারা মূলত সুফিবাদে বিশ্বাসী। আর জাতি হিসেবে এরা ককেশীয় ও পশ্চিম এশীয় নৃ-গোষ্ঠীর সংমিশ্রণ। পৃথিবীর মোট উইঘুরদের বেশিরভাগেরই বসবাস চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে। এ জিনজিয়াং চীনের বৃহৎ কয়েকটি প্রদেশগুলোর অন্যতম এক স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, যদিও নামেমাত্র স্বায়ত্তশাসিত। কারণ বর্তমানে এটি চীনের কেন্দ্রীয় সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে। এই অঞ্চলটির পূর্ব নাম ছিল পূর্ব তুর্কিস্তান। যার সাথে ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, রাশিয়া, মঙ্গোলিয়া, কাজাখস্তান ও তাজিকিস্তান প্রভৃতি দেশ সীমান্ত রয়েছে।

এই জিনজিয়াং এ উইঘুররা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও তারা সামগ্রিক দিক থেকে সবচেয়ে বঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া জাতি। কারণ, কেন্দ্রীয় সরকার এখানে চীনা হান জাতির মানুষদের চাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সার্বিক ক্ষেত্রেই সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে থাকে। তাছাড়াও সরকার উইঘুরদের সংখ্যালঘু করার উদ্দেশে চীনের অন্য অঞ্চল থেকে হানদের তুলে এনে এখানে বসতি স্থাপন করার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। এরকম রাজনৈতিক বৈষম্যজনিত কারণসহ বিভিন্ন কারণেই, এক সময় একদল বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দ্বারা সামপ্রদায়িক দাঙ্গা ও ছোট-বড় বিভিন্ন আক্রমণাত্মক কার্যক্রমের জন্য এক ধরনের অশান্তি বিরাজমান ছিল সেখানে। এজন্য চীনের সরকার বরাবরই পুরো উইঘুর সমপ্রদায়কেই সন্দেহের চোখে দেখে আসছে।

এমনতাবস্থায়, সন্ত্রাসী সাজিয়ে ও আইএসসহ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ততা দেখিয়ে সন্ত্রাস মোকাবিলার কথা বলে সরকার উইঘুরদের বিরুদ্ধে ধরপাকড় ও দমন-পীড়নের বিভিন্ন অভিযান শুরু করে। উইঘুর বসবাসকৃত এলাকাগুলোতে সরকার পুনঃশিক্ষণ কেন্দ্রের নামে বিভিন্ন বন্দিশিবির স্থাপন করে এবং ধরপাকড় চালিয়ে ২০১৭ সাল থেকে সেই বন্দিশিবিরগুলোতে উইঘুর ও অন্য তুর্কি বংশোদ্ভূত মোট ২০ লক্ষ্যের মতো নারী-পুরুষকে (জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী ১০ লাখ) বন্দি করে রাখা হয়েছে। যদিও চীন সরকার দাবি করে আসছে যে, তারা নিজ ইচ্ছায়ই প্রশিক্ষণ নিতে এখানে এসেছে।

তথাপি স্যাটেলাইটে ধারণকৃত কিছু চিত্র এবং কোনোমতে পালিয়ে আসা ব্যক্তিদের কাছ থেকে ওই বন্দিশালায় তাদের প্রতি ঘৃণ্য ও বর্বর নির্যাতনের অনেক তথ্যই রীতিমতো অবাক করে দেয়। তুরসুনে জিয়াদুন নামক এক নারী ওই শিবির বা ক্যাম্প থেকে পালিয়ে কাজাখস্তানে চলে যাওয়ার পর, বিবিসিকে সাক্ষাৎকার দেয়ার মাধ্যমে বেশ কিছু তথ্য প্রকাশ করে দেন। ইলেকট্রিক লাঠি দিয়ে যৌনাঙ্গে শক দেয়া, ধর্ষণ-গণধর্ষণ ও সারা শরীরে হায়েনার মতো কামড়ানোসহ তার ওপর চালানো নানা রকমের পাশবিক বর্বরতার কথা তিনি জানান। চেয়ার, দস্তানা, হেলমেট ও পায়ুপথে, এই চারটি উপায়ে সেখানে মূলত নারীদের ইলেকট্রিক শক দেয়া হয় বলে বিবিসিকে জানান আরেক উজবেক নারী। এভাবে জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, ধর্ষণ ও গণধর্ষণসহ অন্য বিভিন্ন কাজে বাধ্যকরণ করা হয় নারীদের। এমনও জানা গেছে যে, সেখানকার রক্ষীরা যাকে ইচ্ছা তাকেই ধর্ষণ করে থাকে। আর বিশেষ করে তাদের সবকিছুই ভিডিও ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি করা হয়, এমনকি টয়লেটেও ক্যামেরা বসানো থাকে বলে এক সূত্রে জানা গেছে।

এভাবে পুরুষদেরও বিভিন্নভাবে শারীরিক ও মনস্তাত্তি্বক নির্যাতনের সম্মুখীন করা হয় প্রতিনিয়ত। দাড়ি রাখা, টুপি ব্যবহার, নামাজ পড়া ও রোজা রাখারসহ উইঘুর মুসলিমদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সকল কার্যাবলী থেকে জোরপূর্বক বিরত রেখে তাদের শিখানো হয় একদলীয় ও কর্তৃত্ববাদী শাসক শি জিন পিংয়ের কমিউনিস্ট পার্টির সস্নোগান, শেখানো হয় মান্দারিন ভাষা, জোর করে খাওয়ানো হয় শূকরের মাংস এবং জোর করে ধর্মান্তরিত করার ঘটনাও সেখানে নিত্য- নৈমিত্তিক।

আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানীমূলক সাংবাদিক সংস্থা 'আইসিআইজে' এর এক রিপোর্টে উইঘুরদের বন্দিশিবির পরিচালনার গোপন কৌশল বা কেন্দ্রীয় নির্দেশনাসমূহ উঠে এসেছে। নির্দেশনাবলী অনেকটা প্রায় এরকমই, যেমন: কখনোই পালানোর সুযোগ দিও না, শৃঙ্খলা ও শাস্তি বাড়াতে থাকো, কেউ আচরণবিধি লংঘন করলে কঠোর শাস্তি প্রদান কর, স্বীকারোক্তি প্রদান ও অনুতপ্ত হতে উৎসাহিত কর, মান্দারিন ভাষা শেখানোতে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দাও, পুরোপুরি বদলে যেতে অনুপ্রাণিত কর এবং পুরো ভিডিও নজরদারি চালাও, কোনো জায়গাই যেন বাদ না থাকে ইত্যাদি।

তাছাড়াও বিবিসির তথ্যমতে, উইঘুরদের ঘরবাড়ির দরোজায় বসিয়ে দেয়া হয়েছে বিশেষ কোড, লাগিয়ে দেয়া হয়েছে মুখ দেখে শনাক্তকারী ক্যামেরা, ফলে কোনো বাড়িতে কে কখন আসে-যায় সব খবর নিয়ন্ত্রণ করে কর্তৃপক্ষ। আবার বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের বায়োমেট্রিঙ্ পরীক্ষাও নেয়া হয়। এসবের মাধ্যমে কাউকে সন্দেহ হলেই নিয়ে যাওয়া হয় বন্দিশালায়।

এককথায়, চীনা সরকার উইঘুরদের ধর্ম, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যসহ নিজস্ব সকল আচার-আচরণ পরিবর্তনের মাধ্যমে ধর্মীয় ও জাতিগত নিধন প্রক্রিয়ার সকল পথই খোলা রেখেছে। বিডি ভিউজ এর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, রোজার দিনে উইঘুরদের রোজা রাখতে দেয়া হয় না, বরং বাড়িতে গিয়ে রোজা ভাঙানো হয়। তাদের প্রাচীন সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র, কাশগরের অসংখ্য প্রাচীন ভবন ও স্থাপনা ভেঙে পর্যটন কেন্দ্র বানানো হয়েছে। এমনকি দুই বছরে ৩১ টি মসজিদ ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে বলে ্তুদ্যা গার্ডিয়ান এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জিনজিয়াংয়ে নতুন কোনো মসজিদ নির্মাণ করতে দেয়া হয় না। যদি অনুমতি মেলে তাও আবার বৌদ্ধ মন্দিরের আদলে নির্মাণ করতে হয়। মসজিদের ইমামও সরকারিভাবে রাখা হয়। জুমার খুতবায় ইমাম কি বলবেন সেটিও তদারকি করে প্রশাসন। আর হজে যাওয়ার ব্যাপারেও আছে নিষেধাজ্ঞা। খুব অল্প সংখ্যক মুসলমানই হজ করতে পারে। জিনজিয়াংয়ের স্কুলগুলোতে শিশুরা নিজস্ব ধর্ম ও ভাষা চর্চা করতে পারে না। কারণ, শিক্ষার সকল কার্যক্রমই মান্দারিন ভাষায় সাজানো। মুসলিম তরুণীদের বৌদ্ধ ছেলেদের সাথে জোরপূর্বক বিয়ে দেয়ার ঘটনাও সেখানে স্বাভাবিক।

এভাবে দমন-পীড়ন, অত্যাচার-নির্যাতন ও বিভিন্ন হস্তক্ষেপের মাধ্যমে শি জিন পিং সরকার দিন দিন উইঘুরদের অস্তিত্ব চিরতরে বিলীন করার যে সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছে, তা সম্পূর্ণভাবে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার লংঘন। পৃথিবীর কোনো সরকার, দেশ ও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কারোরই এরকম জাতিগত বৈষম্যের ব্যানারে কোনো মানুষের মৌলিক অধিকার হরণের অধিকার নেই। তারপরও চীন নির্ভয়ে কোনোরকম বাধা বিপত্তি ব্যতিরেকেই উইঘুর দমনে বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত করেই যাচ্ছে।

চীনা সরকারের এসব ঘৃণ্য কর্মকা-ের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা দেশগুলো অনেকটা অগ্রগামী হলেও বাকিরা যেন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক ও শক্তিশালী সংস্থার প্রতিনিধি দলকেও বন্দিশিবিরগুলোতে প্রবেশাধিকার প্রদানপূর্বক তদন্ত পর্যন্ত করার অনুমতি দিচ্ছে না চীন। উইঘুর মুসলিমদের পাশে দাঁড়ানোর বিপরীতে সৌদি আরব, ইরান, তুরস্ক ও পাকিস্তানসহ অধিকাংশ মুসলিম দেশই অনেকটা নিশ্চুপ হয়ে আছে। মুসলিম দেশসমূহের ৫৭ সদস্যের আন্তর্জাতিক সংস্থা ওআইসি এর ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। পৃথিবীর সর্ব বৃহৎ সামরিক শক্তি, চীনের বিরুদ্ধে উইঘুর ইস্যুতে কেউ বিবৃতি পর্যন্ত দিতেও যেন শঙ্কা বোধ করছে। তাছাড়াও বিভিন্ন দেশে চীনের বিরাট অংকের অর্থনৈতিক বিনিয়োগও এক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এরকম নির্যাতিত ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত মানুষগুলো যে জাতি বা ধর্মেরই হোক না কেন, তারা মানুষ এই প্রেক্ষিতে হলেও দল-মত, ধর্ম-বর্ণ ও জাতি নির্বিশেষে, মানবাধিকার রক্ষার্থে, সমগ্র বিশ্বের স্বাধীন দেশগুলোকে তাদের পাশে দাঁড়ানো নৈতিক দায়িত্ব। এজন্য পুরো বিশ্বকে এক হয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে চীন সরকারের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে, এমনকি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ আরোপ করে হলেও সমস্যা সমাধানের জন্য এগিয়ে আসা উচিত।

মো. জাফর আলী : লেখক
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আনার মতামত দিন।
মতামত দিতে চাইলে অনুগ্রহ করে করুন।
আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন।
সর্বাধিক পঠিত
ফটো গ্যালারি
আজকের পত্রিকা
আজকের নামাজের সময়সূচীমে - ১৩
ফজর৩:৫৪
যোহর১১:৫৫
আসর৪:৩৩
মাগরিব৬:৩৫
এশা৭:৫৪
সূর্যোদয় - ৫:১৭সূর্যাস্ত - ০৬:৩০
পুরোন সংখ্যা
বছর : মাস :
আজকের পাঠকসংখ্যা
৮৮০১.০
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতিঃ সৈয়দ এম. আলতাফ হোসাইন। সম্পাদক : আহ্সান উল্লাহ্। প্রকাশক ছৈয়দ আন্ওয়ার কর্তৃক রোমাক্স লিমিটেড, তেজগাঁও শিল্প এলাকা থেকে মুদ্রিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : খলিল ম্যানশন (৩য়, ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলা), ১৪৯/এ, ডিআইটি এক্সটেনশন এভিনিউ, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত। ফোন : ৯৩৫৭৭৩০ (বার্তা), ৮৩১৫৬৪৯ (বাণিজ্যিক), ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪.
ই-মেইলঃ djanata123@gmail.com, bishu.janata@gmail.com
ফোনঃ ০২৮৩১৫১১৫, ০২৮৩১৫৬৪৯ ফ্যাক্সঃ ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪
Copyright The Dainik Janata © 2010 Developed By : orangebd.com.