নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা, বৃহস্পতিবার ৮ এপ্রিল ২০২১, ২৫ চৈত্র ১৪২৭, ২৪ শাবান ১৪৪২
হিজরারা বিড়ম্বনা নয়
রুকাইয়া মাহজাবিন
'হিজরা'-তিন অক্ষরের শব্দটি দু'বার না মনে-মনে একবার উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে উঠে প্রচ- জ্যামে যানবাহনে, কোলাহলপূর্ণ জায়গায় কিংবা অন্যত্র হাততালি দিয়ে হিজরাদলের দাবিকৃত অর্থ আদায়ের দৃশ্য এবং যখন তারা তাদের চাহিদা মতো অর্থ পায় না তখন তাদের ভিতর দেখা যায় নানা অশোভনীয় আচরণ। এদের বেশি দেখা যায় নবজাতকের বাসায় যেখানে তারা বাচ্চা কোলে নিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করে। এমনকি অভিভাবকের অর্থ প্রদানের ক্ষমতা না থাকলেও তারা তাদের চাহিদা অটল রাখে, কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। হিজরাদের নানা রকম দৃষ্টিকটু আচরণের কারণে সাধারণ মানুষ তাদের খারাপ চোখে দেখে এমনকি অনেকে কটাক্ষ করে কথাও বলে। হিজরাদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের যেমন ঘৃর্ণা, উপহাস এবং তাচ্ছিল্যের দৃশ্য দেখা যায় তেমনি হিজরাদের ভিতরেও রয়েছে সাধারণ মানুষ নিয়ে ক্ষোভ এবং আক্ষেপ।

হিজরা জনগোষ্ঠী যাদের জন্মের সময়ে নির্ধারিত লিঙ্গ পরিচয়ের সাথে জীবনযাপন পদ্ধতি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় (এ জনগোষ্ঠী নিজেদের চিরাচরিত লিঙ্গের চেয়ে ভিন্ন কিছু ভাবতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে)। একজন হিজড়া সাধারণত নিজ আগ্রহে পছন্দের লিঙ্গ পরিচয় এবং এ জীবনযাপন পদ্ধতি বেছে নেয়, কিন্তু তারা তাদের পছন্দের লিঙ্গ পরিচয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে স্থায়ীভাবে শারীরিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করতে পারে অথবা পারে না। বাংলা অভিধানে হিজরা বলতে বোঝানো হয়েছে একই দেহে স্ত্রী ও পুং চিহ্নযুক্ত মানুষ কিংবা অন্য প্রাণী।

আমরা যারা সভ্য সমাজে বাস করি তারা হিজরাদের সংজ্ঞায়িত করি তৃতীয় লিঙ্গ হিসাবে। বিভিন্ন ইন্টারভিউ-এ দেখা যায় হিজরাদের তৃতীয় লিঙ্গ বলায় তাদের ভিতর একটা মনোঃকষ্ট রয়েছে, আক্ষেপ রয়েছে প্রথম ও তৃতীয় লিঙ্গ সম্পর্কে জানার। হিজরা বলতেই আমরা আমাদের মনের মধ্যে খারাপ একটা প্রতিবিম্ব ধারণ করি। আসলে হিজরারাও তো রক্ত, মাংসে গড়া আর দশটা সাধারণ মানুষের মতো মানুষ। তবে কেনো আমরা তাদের মেনে নিতে পারি না। হিজরা হয়ে জন্মানোতো তাদের দোষ নয়! অথচ আমরা সভ্য সমাজের মানুষ হয়ে হিজরাদের সমাজ থেকে, পরিবার থেকে বের হতে বাধ্য করি। তাদের পরিবার তাদের দায় মনে করে অন্য আর পাঁচটা বাচ্চার মতো বেড়ে উঠতে সাহায্য করে না। উল্টো তাদের ঠেলে দেয় অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। যেখানে নেই কোনো ভালোবাসা, নেই কোনো সম্মান। পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোথাও যখন তাদের ঠাঁই হয় না তখন তারা বেছে নেয় অপ্রীতিকর পন্থা যা দেখে আমরা সভ্য সমাজের মানুষ নাক সিটকাই, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করি। আসলে তো এ দায় তাদের নয়। একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে চাই- বিভুতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় তার বিড়াল প্রবন্ধে বিড়ালকে চুরি করে খাওয়ার জন্য দোষারোপ করায় বিড়াল প্রত্যুত্তরে বলেছে- 'চোরকে শাস্তি দেয়ার আগে তিন দিবস উপবাস করিবেন তাহাতে যদি আপনার চুরি করিয়া খাইতে ইচ্ছা না করে, তাহলে স্বাচ্ছন্দ্যে চোরকে ফাঁসি দিবেন'। দোষ আমাদের সুশীল সমাজের মানুষের যারা হিজরাদের কাছে থেকে সকল অধিকার কেড়ে নিই। কিন্তু জীবন বাঁচানোর তাগিদে তারা যখন অসামাজিক কাজে লিপ্ত হয় আমরা তাদের দোষারোপ করি, সমাজ নষ্টের কারিগর হিসাবে আখ্যায়িত করি।

সাধারণ মানুষের হিজরাদের নিয়ে রয়েছে অবহেলা ও বৈষম্য। সেই বৈষম্য দূর করতে সমাজের মূলধারায় তাদের সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে ২০১৩ সালে নভেম্বর মাসে হিজরা জনগোষ্ঠীকে তৃতীয় লিঙ্গ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে সরকার। এবং ২০১৪ সালের ২৬ জানুয়ারি হিজরাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট প্রকাশ করেছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেয়ার কারণে হয়তো সুশীল সমাজে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। জন্মের পর হিজরা হওয়া সত্ত্বেও পরিবার তাদের দায় গ্রহণ না করলেও কিছুটা স্বস্তি মিলেছে হিজরাদের। তবে হিজরাদের কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা, চাঁদাবাজি, যৌনচার, জবরদস্তিমূলক টাকা আদায় ও ভিক্ষাবৃত্তির মতো ঘটনা এখনো দেখা যায়। যার কারণে সমাজে হিজরাদের এখনো বিড়ম্বনা মনে করা হয়।

আমরা যারা সুশীল সমাজে বাস করি তারা চাইলেই হিজরাদের পরিবারে, সমাজে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে সমানভাবে সুযোগ করে দিতে পারি। হিজরাদের বিড়ম্বনা মনে না করে সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে আনতে পারি।

আজকাল দেখা যাচ্ছে তারাও নিজের চেষ্টায় সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে পেরেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হিজরার নাম শাম্মী, যে একজন পার্লারের মালিক। সমাজে কুরুচিপূর্ণ চলাফেরা বাদ দিয়ে কর্মক্ষেত্রে তৈরি করেছে নিজের এবং তার মতো আরো অনেক হিজরাদের। বিবিসি নিউজের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়েছে দেশ থেকে দেশান্তরে। অনুপ্রাণিত হয়েছে আরো অনেকে। হিজরাদের অপ্রীতিকর জীবন ছেড়ে কেবল ইচ্ছা শক্তি দিয়ে অনেক কিছু করা যায় তা দেখিয়ে দিয়েছে। একজন উদ্যোক্তা হিসাবে নিজেকে করেছে সাফল্যম-িত। সময়ের বিবর্তনে হিজরাদের সম্পর্কে জানা যায় আরো অনেক সুখবর! বর্তমানে বহুল আলোচিত আরেকজন ট্রান্সজেন্ডার নারী তাসনুভা সংবাদ পাঠক হিসাবে টিভি চ্যানেলে কাজ করছে সমাজের কটাক্ষকে উপেক্ষা করে। এছাড়াও বলতে পারি রানী চৌধুরীর কথা যে নাচের উপর ইন্ডিয়া থেকে বিশেষ ট্রেনিং নিয়ে বাংলাদেশে এসে সাত বছর ধরে কাজ করছে একজন উদ্যোক্তা হিসাবে, জড়িত আছেন বিভিন্ন সংগঠনের সাথে কাজের সুযোগ করে নিয়েছে তার সসমগোত্রীয় আরো অনেক হিজরাকে। জানা এবং আজানার মধ্যে আরো অনেক হিজরা রয়েছে যারা সমাজের অবহেলার পাত্র হিসাবে থাকতে চায় না। তারা দেখিয়ে দিতে চায়, তারাও পারে। শুধু দরকার একটা সুযোগ। নিজের চেষ্টার শিক্ষিত এবং যোগ্য কিছু হিজরা বিভিন্ন ইন্টারভিউ-এ অভিযোগ করেছে কর্মক্ষেত্রে তাদের সমান সুযোগ দেয়া হয় না। অনেক সময় তাদের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য শুনতে হয়, আবার কেউ কেউ করেন প্রশংসা। সমাজ অনেকটা পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। এই পরিবর্তনের ধারা অব্যাহত রেখে সমাজের একজন বিবেকবান মানুষ হিসাবে আমাদের উচিত সকল প্রকার বৈষম্য দূর করে তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া। পরিবার ও সমাজ থেকে মেনে নিয়ে তাদের বিড়ম্বনা মনে না করে সকলের উচিত তাদের সম্ভাবনাময় করে গড়ে তুলে সামাজিকভাবে মর্যাদা দেয়া।

রুকাইয়া মাহজাবিন : লেখক

এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আনার মতামত দিন।
মতামত দিতে চাইলে অনুগ্রহ করে করুন।
আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন।
সর্বাধিক পঠিত
ফটো গ্যালারি
আজকের পত্রিকা
আজকের নামাজের সময়সূচীজুন - ১৬
ফজর৩:৪৩
যোহর১১:৫৯
আসর৪:৩৯
মাগরিব৬:৫০
এশা৮:১৫
সূর্যোদয় - ৫:১০সূর্যাস্ত - ০৬:৪৫
পুরোন সংখ্যা
বছর : মাস :
আজকের পাঠকসংখ্যা
১০৪৮১.০
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতিঃ সৈয়দ এম. আলতাফ হোসাইন। সম্পাদক : আহ্সান উল্লাহ্। প্রকাশক ছৈয়দ আন্ওয়ার কর্তৃক রোমাক্স লিমিটেড, তেজগাঁও শিল্প এলাকা থেকে মুদ্রিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : খলিল ম্যানশন (৩য়, ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলা), ১৪৯/এ, ডিআইটি এক্সটেনশন এভিনিউ, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত। ফোন : ৯৩৫৭৭৩০ (বার্তা), ৮৩১৫৬৪৯ (বাণিজ্যিক), ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪.
ই-মেইলঃ djanata123@gmail.com, bishu.janata@gmail.com
ফোনঃ ০২৮৩১৫১১৫, ০২৮৩১৫৬৪৯ ফ্যাক্সঃ ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪
Copyright The Dainik Janata © 2010 Developed By : orangebd.com.