নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা,সোমবার ৫ আগস্ট ২০১৩, ২১ শ্রাবন ১৪২০, ২৬ রমজান ১৪৩৪
পরাজিতের মনোভাবের রায়
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
আমরা নিষ্ঠুর হতে পারলাম না। কেন পারলাম না? এই প্রশ্নটি গত ১৫ জুলাই থেকে আমাকে পিছু তাড়া করছে। একাত্তরে যুদ্ধাপরাধীদের নেতা গোলাম আযমের প্রত্যাশিত মৃত্যুদ-াদেশ ৯০ বছরের কারাদ-ে রূপান্তরিত হয়ে যাওয়ার পর মানবতার এই মহাশত্রুর অন্তত শাস্তি হয়েছে জেনে প্রাথমিকভাবে খুশি হয়েছি। কিন্তুু তারপরই মনে এই প্রশ্নটি জেগেছে_ এত বড় অপরাধীর এই লঘু শাস্তি কেন? যেখানে তাঁর কোন কোন সহচর বা সহদুস্কৃতির প্রাণদ-াদেশ হয়েছে সেখানে সকল অপরাধের পালের গোঁদার যত দীর্ঘ মেয়াদেই হোক, কারাদ- কেন?

বাংলাদেশের সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট এবং প্রগতিশীল ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলো এই রায় প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং পরদিন মঙ্গলবার হরতালও ডেকেছিলেন। হরতাল হয়ত কিছুটা সফল হয়েছে। কিন্তুু আরেক যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদ- দানের বদলে যাবজ্জীবন কারাদ- দানের রায় প্রকাশিত হওয়ার পর প্রতিবাদে ঢাকার শাহবাগে যে ক্ষুব্ধ জনসিংহের গর্জন শোনা গিয়েছিল, তা কি এবার শোনা যাবে?

পরিস্থিতি বদলে গেছে। ক্ষমতার রাজনীতি শাহবাগের বিশাল গণজাগরণের পিঠে ছুরিকাঘাত করেছে। হেফাজতিদের সঙ্গে কখনও দমন, কখনও প্রণয়ের নীতি জনমনকে বিভ্রান্ত করেছে। শাহবাগের বস্নগারদের গ্রেফতার ও নির্যাতন জনসাধারণের মনে এই বিশ্বাসই দৃঢ়মূল করেছে যে, আসলেই শাহবাগ আন্দোলন ছিল নাস্তিক ও মুরতাদদের। নইলে বিএনপি নেত্রী তাদের বিরুদ্ধে যা-ই বলুন, আওয়ামী লীগ সরকার কেন নির্দোষ বস্নগারদেরও জেল-জুলুমের মুখে ঠেলে দেবেন? হেফাজতিদের তুষ্ট করার জন্য নয় কী?

এক কথায়, ৫ মে তারিখে ঢাকার শাপলা চত্বর থেকে হেফাজতিরা পালিয়েছে, কিন্তুু পরাজিত হয়নি। এটা ছিল তাদের সাফল্যজনক পশ্চাতপসারণ (ংঁপপবংংভঁষ ৎবঃৎবধঃ)। পালিয়ে গিয়ে তারা নির্বাচনের মাঠে সঙ্ঘবদ্ধ হয়েছে। সরকার তাদের পশ্চাতধাবন করে নির্মূল করেননি। দু' শ' বছর আগে নবাব সিরাজউদ্দৌল্লা কলকাতায় ইংরেজদের দুর্গ আক্রমণ করে দখল করেন। ক্লাইভ তার সেনাবাহিনী নিয়ে নৌকাযোগে মাদ্রাজে পালিয়ে যান। বাংলায় অবস্থানকারী ফরাসী সেনাপতি নবাবকে পরাজিত ইংরেজদের পশ্চাতধাবণ করে নিশ্চিহ্ন করার পরামর্শ দিয়েছিলেন এবং সে জন্য তার নৌবাহিনী নবাবকে ধার দিতেও চেয়েছিলেন। নবাব তাঁর পরামর্শ শোনেননি। তার পরিণতি হলো, ক্ল্লাইভ মাদ্রাজে পালিয়ে গিয়ে শক্তি সঞ্চয় করেন এবং পরে পলাশীর যুদ্ধে নবাবকে পরাজিত ও হত্যা করেন।

বাংলাদেশের বর্তমান আওয়ামী লীগারদের ইতিহাস শুনিয়ে কোন লাভ নেই। তাদের অধিকাংশই ইতিহাস পড়েন না এবং ইতিহাস বোধও তাদের নেই। নইলে যখন তারা '৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মতো কঠিন কাজে হাত দেন, তখন অসম্ভব শক্তিশালী মৌলবাদী ব্যাকলাস বা ভয়ঙ্কর পাল্টা হামলা সম্পর্কে সচেতন থেকে তার প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেয়া তাদের উচিত ছিল। দেশের জনগণ যেহেতু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি চায়, সেহেতু এই বিচারের দ্বিতীয় রায় প্রকাশিত হতেই শাহবাগে উত্তাল গণজাগরণ তৈরি হয়। এই জাগরণের মুখে আগ্রাসী মৌলবাদ ছিল পাশ্চাতপসারণরত।

সরকার প্রথমে এই গণজাগরণ মঞ্চের সামনের রাজনৈতিক সুযোগ গ্রহণ করেছেন এবং পরে সুবিধাবাদি ক্ষমতার রাজনীতির স্বার্থে এই মঞ্চকে বর্জন করেন। এই মঞ্চটি ভেঙে দেয়ার ফল দাঁড়ায় হেফাজতি অভ্যুত্থানের মুখে জনতার যে জাগ্রত প্রতিরোধ তা বিলুপ্ত হয় এবং হেফাজত ঘুরে দাঁড়াবার সাহস ও শক্তি পায়। তাদের নেপথ্য সহযোগী ছিল জামায়াত এবং বিএনপি।

যেখানে আওয়ামী লীগ সরকারের উচিত ছিল, শাপলা চত্বর থেকে হেফাজতিদের বিতাড়নের পর যখন তারা পলায়নপর, তখন গণজাগরণ মঞ্চকে ভেঙে না দিয়ে সারাদেশে সম্প্রসারিত করা এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত প্রসারিত জামায়াত ও হেফাজতের নেটওয়ার্ক ভেঙে ফেলা, সেখানে ভোটের ও ক্ষমতার রাজনীতির দুর্বলতা আওয়ামী লীগকে পেয়ে বসে এবং তারা সম্ভবত ভাবেন যে, ধর্মের নামে দেশের সহজ সরল মানুষকে যখন হেফাজতিরা প্রভাবিত করতে পারছেই তখন তাদের একটু প্রশ্রয় দিয়ে কাছে টেনে জামায়াত ও বিএনপিকে শিক্ষা দেয়া যায় কিনা দেখা যাক। সরকারের নীতিনির্ধারকদের বুদ্ধির বলিহারি! তাদের মাথায় হয়ত এই সহজ সত্যটা ঢোকেনি যে, জামায়াত ও হেফাজত একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। আওয়ামী লীগের গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিকে কোন দিন এরা সমর্থন দেবে না। ভোট দেয়া তো দূরের কথা।

আওয়ামী লীগ ইতিহাস থেকে কোন শিক্ষা অতীতে নেয়নি, এখনও নিচ্ছে না এটাই আমার দুঃখ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম আওয়ামী লীগ সরকার জামায়াত মুসলিম লীগসহ দেশের সাম্প্রদায়িক দলগুলোকে কেবল নিষিদ্ধ ঘোষণা করেই ভেবেছিলেন সেক্যুলার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়ে গেছে। সাম্প্রদায়িকতা যে ক্যান্সারের মতো একটা ভয়াবহ রোগ বীজাণু, তা তারা ভাবেননি। সমাজ, রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা থেকে সাম্প্রদায়িকতা নির্মূল করার কোন ব্যবস্থা, কোন কর্মসূচি তারা গ্রহণ করেননি। ফলে সাম্প্রদায়িক দল নিষিদ্ধ ঘোষিত হলে কী হবে, এর দূষিত বীজাণু ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগের ভেতরেই অনুপ্রবিষ্ট হয়েছে।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সরকার হয়তো ভেবেছিলেন, রমনার মাঠে ঘোড়দৌড় বন্ধ করে (পবিত্র মক্কাতেও ঘোড় দৌড় নিষিদ্ধ নয়), প্রকাশ্যে মদ্যপান বন্ধ করার নির্দেশ দিয়ে, সৌদি আরব তখন বাংলাদেশকে স্বীকৃতী না দেয়া সত্ত্বেও পবিত্র কাবা শরীফের জন্য গিলাব পাঠিয়ে, আলীয়া মাদ্রাসার জন্য লাখ লাখ টাকা অনুদান দিয়ে ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিরাট অর্থ সাহায্য মঞ্জুর করে, লাহোরে ইসলামি শীর্ষ বৈঠকে যোগ দিয়ে হয়তো বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী দল এবং গোত্রগুলোর হৃদয় জয় করা যাবে। পরিণতি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে (দুই কন্যা ছাড়া) নির্মম শাহাদাতবরণ। মস্ক এন্ড মিলিটারির ক্ষমতা দখল।

১৯৯৬ সালে খালেদা হঠাও আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন জামায়াতীদের সমর্থনের কোন দরকার না থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৫ দলীয় জোটের সহযোগী সেজে জামায়াতকে সমান্তরাল আন্দোলন করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। আসলে জামায়াত আন্দোলন করতে চায়নি চেয়েছে আওয়ামী লীগের সাহচর্যে এসে যুদ্ধাপরাধের কলঙ্ক গা থেকে মুছে ফেলতে। সেবার জামায়াতের ভোট কি আওয়ামী লীগ পেয়েছিল? নির্বাচনের সাতদিন আগেই ফাঁস হয়ে গেল, জামায়াত নেতা গোলাম আযম সর্বত্র জামায়াতীদের কাছে গোপন নির্দেশ পাঠিয়েছেন যে, জামায়াত সমর্থক ভোটদাতারা যেন আওয়ামী লীগকে ভোট না দিয়ে বিএনপিকে দেয়।

অতপর আওয়ামী লীগের প্রয়াত সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল কর্তৃক স্বাক্ষরিত ফতোয়া চুক্তি। এই চুক্তি কি আওয়ামী লীগের সুনাম ও সেক্যুলার ভাবমূর্তি নষ্ট করা ছাড়া নির্বাচনে বা অন্য কোনভাবে আওয়ামী লীগকে সাহায্য করেছে? বিভিন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা দেখলেই বোঝা যায়, আওয়ামী লীগ জেতে নিজস্ব ভোট ব্যাংকের ভোট এবং তার সঙ্গে ফ্লোটিং ভোট যোগ হলে। ফ্লোটিং ভোট বিযুক্ত হলে আওয়ামী লীগ হারে। আর ভয়ভীতি দেখিয়ে যদি নারী ও সংখ্যালঘু ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে আসতে না দেয়া হয় অথবা তারা কোন কারণে আওয়ামী লীগকে ভোট না দেয় তাহলে আওয়ামী লীগ বিরাটভাবে হারে। ইসলামি দলগুলোর (দু'একটি ছোট দল ছাড়া) সমর্থক ভোটারদের ভোট আওয়ামী লীগ কখনও পেয়েছে, তার কোন নজির নেই। তবু আওয়ামী লীগ কেন এই মায়া মরীচিকার পেছনে ছুটতে চায় তা আমার জানা নেই।

এ বছর ৫ মে শাপলা চত্বর থেকে হেফাজতিদের বিতাড়নের আগে এবং পরে তাদের মন জয় করার জন্য গোপন প্রশ্রয়দানের নীতি গ্রহণ করা কি সঙ্গত হয়েছে? হেফাজতীরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে এক হাতে গোলাপ ফুল এবং অন্য হাতে ছুরি হাতে খেলেছে এবং সিটি কর্পোরেশনগুলোর গত পাঁচটি নির্বাচনে সেই ছুরির খেলা দেখিয়েছে। আগেই বলেছি, হেফাজত ও জামায়াত এখন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। হেফাজতকে জামায়াতীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে বা জামায়াতকে বিএনপির কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাজনৈতিক কৌশলের খেলা আওয়ামী লীগের জন্য সাপ ও ব্যাঙের মুখে এক সঙ্গে চুমু খাওয়ার মতো হবে। এখনই সাবধান হয়ে সর্বনাশা চাতুরির খেলা না বদলালে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আম এবং ছালা দুই-ই হারাবে।

একই গ্যাঙের চোরদের কঠিন শাস্তি দিয়ে চোরের সর্দারের প্রতি অনুকম্পা দেখানোর মতো হয়েছে '৭১ এর যুদ্ধাপরাধীদের নেতা গোলাম আযমের বিচারের রায়ে। এই বিচার ট্রাইব্যুনালের মাননীয় বিচারপতিদের প্রতি সম্পঁর্ণ শ্রদ্ধা ও আস্তা রেখেই বলছি, ইতোপূর্বে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে দেশের খ্যাতিমান বুদ্ধিজীবীদের উদ্যোগে গঠিত গণআদালতে গোলাম আযমকে যে ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়েছিল, সেই গণআদালত এবং তার রায়ের প্রতিও বর্তমান রায়ে কোন প্রকার সম্মান দেখানো হয়নি।

দেলাওয়ার হোসাইন সাইদী এবং গোলাম আযমের রায়ের মধ্যেও রয়েছে বিস্ময়কর কনট্রাডিকশন। দেলাওয়ার হোসাইন সাইদীর রায়ে বলা হয়েছে, আমরা বর্তমান আল্লামা সাইদীর বিচার করছি না। বিচার করছি চলি্লশ বছর আগের রাজাকার দেলোয়ার হোসেন শিকদারের। সাইদীকে মৃত্যুদ-াদেশ দেয়া হয়েছে। এখন এই রায়কেই সামনে রেখে প্রশ্ন করা চলে, আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ বিচার ট্রাইব্যুনাল কি বর্তমানের অশীতিপর বৃদ্ধ গোলাম আযমের বিচার করছেন, না চলি্লশ বছর আগের সাতচলি্লশ বছর বয়সী রাজাকার নেতা এবং মানবতার জঘন্য শত্রু গোলাম আযমের বিচার করেছেন? সাইদী যদি মৃত্যুদ-াদেশ পায়, তাহলে গোলাম আযম গ্যাঙ লীডার হয়ে অনেক কম শাস্তি পায় কি করে? কেবল তাঁর বর্তমানের বয়স হিসেব করে কি?

বয়স হিসেব করে মানবতার শত্রুদের প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শনের কোন নজির হেগসহ বিশ্বের কোন আন্তর্জাতিক আদালতে আছে কি? বয়োবৃদ্ধ আইসম্যানকে কি ইসরাইলী আদালত ক্ষমা করেছিল? নব্বই-ঊর্ধ্ব ফরাসী রাজাকার মার্শাল পেঁতাকে কি তার অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত কোন অনুকম্পা দেখানো হয়েছিল? তাহলে বাংলাদেশে এই শিশুঘাতী, নারীঘাতী বর্বরতার গোত্র সর্দারের প্রতি আমাদের এতো অনুকম্পা কেন? মির্জাপুরের ভারতেশ্বরী হোমের প্রতিষ্ঠাতা নব্বই-ঊর্ধ্ব বয়সের রায়বাহাদূর রণদাপ্রসাদ সাহাকে যখন রাজাকারদের সহযোগিতায় তার রোগ শয্যা থেকে তুলে এনে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল, কিংবা ফরিদপুরের খাদেমূল ইনসান চ্যারিটির প্রধান অশীতিপর সেকান্দার আলী শাহকে জামায়াতিরা হাত, পা কেটে খুন করেছিল, তখন নরপিশাচ গোলাম আযমের মনে কিছুমাত্র অনুকম্পা কিংবা অনুশোচনা দেখা দিয়েছিল কি?

এই বয়সেও স্বীকার করতে দ্বিধা করছি না, শুভ্র দাড়ি, মাথায় টুপি, ফেরেশতার সাজে সজ্জিত গোলাম আযমের চেহারার অন্তরালে কী ঘৃণ্য নরপশু বাস করে, তা স্মরণ হলে মৃত্যুদ-ও তাঁর জন্য খুব লঘুদ- বলে আমার কাছে মনে হয়। কেন মনে হয় সে কথাই এখানে লিখছি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তারিখে আমি ছিলাম লন্ডনে। ভোরে ঘুম থেকে উঠেই বঙ্গবন্ধু হত্যার খবর পাই। শোকে, ব্যথায়, বেদনায় আমরা যখন মূহ্যমান, তখন সম্ভবত ১৬ আগস্ট তারিখেই বঙ্গবন্ধু হত্যায় বিভিন্ন জনের প্রতিক্রিয়া প্রচার করছিল লন্ডনের একটি টেলিভিশন। তাতে গোলাম আযমের প্রতিক্রিয়াও দেখানো হয়েছে। সেই টুপিধারী দাড়িওয়ালা লোকটি একজন মুসলমানের মৃত্যুতে একবারও ইন্নালিল্লাহি পড়লেন না, নারকীয় হাসিতে মুখ উদ্ভাসিত করে বললেন, 'ট্রেইটরের মৃত্যু হয়েছে।'

সেই থেকে এই নরপশুর প্রতি আমার যে ঘৃণা, তা আজও মুছে যায়নি। এই ঘৃণা আমার মতো আরেকজনের বুকে আছে। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর, সম্প্রতি লন্ডন থেকে বিদায় নেয়া আমাদের প্রাক্তন হাই কমিশনার অধ্যাপক ড. সাইদূর রহমান। '৭১-এর যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচারের জন্য গোলাম আযমকে গ্রেফতার করার খবর প্রচারিত হলে তিনি আমাকে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর গোলাম আযমের দন্ত বিকীর্ণ হাসি এবং বঙ্গবন্ধুকে 'ট্রেইটর' বলে গালি দেয়ার অনুষ্ঠানটি তিনিও দেখেছেন বলে জানান এবং সেই থেকে গোলাম আযমের প্রতি কী তীব্র ঘৃণা পোষণ করেন, তাও বলেন। আমাদের দু'জনের বুকে একই ঘৃণার আগুন জ্বলছে তা বুঝেছিলাম।

ফলে মনে করেছিলাম, যেদিন আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারে গোলাম আযমের ফাঁসির আদেশ হবে, সেদিন আমারও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে বলব, এক নরপিশাচের যথার্থ শাস্তি হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল এই কথাটি বলার সুযোগ শুধু আমাকে নয়, দেশপ্রেমিক কোটি কোটি বাংলার মানুষকেও দিলেন না। আমি মৃত্যুদ- দানের বিরোধী, কিন্তুু যখনই গোলাম আযম এবং তাঁর জামায়াত দলের '৭১-এর সীমাহীন বর্বরতার কথা মনে হয়, তখন চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে 'স্বজন হারানো শ্মশানে তোদের চিতা আমি তুলবোই।'

আওয়ামী লীগের এক নেতা আমাকে বলেছেন, 'গোলাম আযমের বিচারের যে রায় হয়েছে তাতে তারা আনন্দিত। কারণ, এই বৃদ্ধ লোকটিকে মৃত্যুদ- দেয়া হলে দেশের মানুষের মনে অন্য রকম প্রতিক্রিয়া হতো।' ইনি আওয়ামী লীগের তরুণ প্রজন্মের নেতা। হয়তো '৭১ সালের বর্বরতা ও বিভীষিকার অভিজ্ঞতা তাঁর নেই। তাই একথা বলতে পেরেছেন। যদি তাঁর এই অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতাবোধ থাকত, তাহলে তিনি দেখতেন, জানতেন, এই রায় শুনে কী গভীর বেদনা ও হতাশায় দেশপ্রেমিক মানুষও জেগে ওঠা তরুণ প্রজন্ম ভেঙে পড়েছে। আমি সুদূর লন্ডনে বসেও তা টের পাচ্ছি।

যদি গোলাম আযমের মতো মানবতার জঘন্য শত্রুর কৃতকর্মের সর্বোচ্চ সাজা রায়ে ঘোষিত হতো, তাহলে সারাদেশ যে আবার উৎসাহে, উল্লাসে নতুন আশা নিয়ে জেগে উঠতো তাতে আমার সন্দেহ নেই। পাঁচটা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের পরাজয়ে আওয়ামী লীগসহ গণতান্ত্রিক রাজনীতির শিবিরে এবং দেশপ্রেমিক সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ডিকিটিস্ট মনোভাব ও হতাশা দেখা দিয়েছে, তা এই একটি রায়ে সম্পূর্ণ দূর হয়ে যেতো এবং গণজাগরণ মঞ্চের চাইতেও বড় জাগরণ মঞ্চ তৈরি হতো বাংলার ঘরে ঘরে।

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী : সাংবাদিক কলামিস্ট

সৌজন্যে : এফএনএস

এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আনার মতামত দিন।
মতামত দিতে চাইলে অনুগ্রহ করে করুন।
আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন।
সর্বাধিক পঠিত
ফটো গ্যালারি
আজকের পত্রিকা
Jobs in Bangladesh
Jobs in Bangladesh
আজকের নামাজের সময়সূচীআগষ্ট - ৫
ফজর ৪:০৮
যোহর ১২:০৫
আসর ৪:৪২
মাগরিব ৬:৪২
এশা ৮:০১
সূর্যোদয় - ৫:৩০সূর্যাস্ত - ০৬:৩৭
পুরোন সংখ্যা
বছর : মাস :
আজকের পাঠকসংখ্যা
৪৬৩
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতিঃ সৈয়দ এম. আলতাফ হোসাইন। সম্পাদকঃ আহ্‌সান উল্লাহ্॥ প্রকাশক ছৈয়দ আন্ওয়ার কর্তৃক রোমাক্স লিমিটেড, তেজগাঁও শিল্প এলাকা থেকে মুদ্রিত এবং সড়ক ৩১, বাড়ি ২৩, গুলশান, ঢাকা-১২১২ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ খলিল ম্যানশন (৩য়, ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলা), ১৪৯/এ, ডিআইটি এক্সটেনশন এভিনিউ, ঢাকা-১০০০। ফোনঃ ৮৩১৫১১৫ (বার্তা), ৮৩১৫৬৪৯ (বাণিজ্যিক), ফ্যাক্সঃ ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪.
ই-মেইলঃ
ফোনঃ ০২৮৩১৫১১৫, ০২৮৩১৫৬৪৯ ফ্যাক্সঃ ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪
Copyright The Dainik Janata © 2010 Developed By : orangebd.com.